“গুপ্ত”: যে চিহ্ন নিজেকেই গিলে খায়
উম্মে খায়ের ফারিয়া
বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চে "গুপ্ত" শব্দটি কোনো সাধারণ অভিযোগ হিসেবে আসেনি। এসেছে একটি উপসর্গ (Symptom) হিসেবে। রাজনৈতিক বলয়ে কয়েক দশক ধরে চলে আসা অস্বস্তিকর শূন্যতায় এর জন্ম। যারা এমন করছে, তারা নিজেদের বিশ্বাসের চেয়ে বরং প্রতিপক্ষ কী লুকাচ্ছে সেই সন্দেহ রটনার ভিতরেই নিজেদের পরিচয়কে বেশি সংজ্ঞায়িত করে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আনুগত্যের এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে রাজপথের মিছিলে, দেয়াল লিখনে কিংবা হরতালের চিৎকারে। কিন্তু যা কিছু প্রকাশ্যে ঘোষিত হয়, তার চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী হয়ে রাজত্ব করে যা কিছু ইঙ্গিতময়। প্রচ্ছন্ন শত্রু, গোপন নেটওয়ার্ক আর অদৃশ্য এজেন্ডা, এগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির কোনো প্যারানয়েড পাদটীকা নয়। বরং এগুলোই এদেশের রাজনীতির মাতৃভাষা বা আদিভাষা (Mother Tongue)। “গুপ্ত”, এই অর্থে, স্রেফ একটি শব্দ বা চিহ্ন নয়। বরং এটি একটি বিশেষ ধরন, যা চক্রাকার, অন্ধকারময় এবং এর কোথাও কোন সত্য আদৌ আছে কিনা, তা নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন।
মূলত, ‘গুপ্ত’ শব্দটি শুরুতে ছিল নেহাতই একটি বিশেষণ। লুকানো, গোপন কিংবা প্রচ্ছন্ন। একটি নিস্পৃহ শব্দ মাত্র, যার গায়ে কোনো নির্দিষ্ট ভার বা সন্দেহের তকমা ছিল না। এটি কেবল একটি অবস্থাকে বর্ণনা করত, তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু শব্দ কোনো বদ্ধ পাত্র নয়। শব্দ হলো একটি উপরিতল (Surface)। আর যে কোনো উপরিতলে দীর্ঘকাল বহিঃবস্তুর ঘর্ষণের ফলে ক্ষয়জনিত পরিবর্তন ঘটে। গুপ্ত শব্দটিকে সচেতনভাবে অস্ত্র বানানোর প্রয়োজন পড়েনি। সমকালীন রাজনৈতিক বক্তৃতায় একটি অভিযোগ হিসেবে প্রবেশ করার অনেক আগেই শব্দটি তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলেছিল।
তবুও, গুপ্ত হওয়াটা অর্থাৎ গুপ্ত স্বত্ত্বার কাছে মৌলিক বৈশিস্ট্য হিসাবে “গুপ্ততা” স্রেফ একটি তকমা নয়। এটি ব্রিকোলাজ (Bricolage)-এর এমন এক মাস্টারক্লাস, যা দেখলে ডিক হেবডিজ (Dick Hebdige) নিজেও গর্বিত হতেন। ধারণাটি ক্লড লেভি-স্ট্রস (Claude Lévi-Strauss)-এর কাছ থেকে এসেছে, যিনি ব্রিকোলার (Bricoleur) বলতে এমন একজনকে বুঝিয়েছেন যিনি প্রচলিত কাঠামোর বাতিল অংশ, পরিত্যক্ত উপাদান আর অগোচরে পড়ে থাকা অবশিষ্টাংশ দিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করেন। হেবডিজ এই ধারণাকে ব্যবহার করে দেখিয়েছেন কীভাবে একটি উপসংস্কৃতি (Subculture) মূলধারার সংস্কৃতির ফেলে দেওয়া জঞ্জাল থেকেই প্রতিরোধের চিহ্ন তৈরি করে।
কিন্তু এখানে সেই উপাদানগুলো অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং অধরা(abstract): একটি গালি, একটি নীরবতা, একটি অভিযোগ। এগুলোকে সংগ্রহ করে নতুন রূপ দেওয়া হয় এবং অত্যন্ত চতুরভাবে সেই কাঠামোর দিকেই ছুড়ে দেওয়া হয় যেখান থেকে এগুলোর জন্ম হয়েছিল। এটি মুলতঃ একটি কৌশলগত সংযোজন। গুপ্ত স্বত্ত্বারা মূলধারার প্যারানয়া, ডিজিটাল নীরবতা আর স্থানীয় লোককথার টুকরোগুলো এক এক করে তা থেকে একটি শক্তিশালী বর্ম তৈরি করেছে। এই প্যারানয়া বা সংশয় মূলধারার ক্ষমতাবানদের মাঝে এক ধরণের জরুরি অবস্থার অনুভূতি জোগায়, তলে তলে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে এমন এক ভীতি। বাকি কাজ টুকু করে দেয় ডিজিটাল নীরবতা :একটি নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট, একটি অদৃশ্য মুখ, কিংবা এমন এক অনুপস্থিতি যাকে পাঠ করা হয় সবচেয়ে জোরালো ‘স্বীকারোক্তি’ হিসেবে। আর এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে বাঙালি মানসের সেই পুরোনো লোকজ ব্যাকরণ, যেখানে প্রকাশ্য মানুষের চেয়ে ছায়ায় থাকা চরিত্রের গুরুত্ব সব সময়ই বেশি।
কিন্তু এখানেই তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি আরও কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে ওঠে। এটি হেবডিজের ধ্রুপদী নিচ(Niche) থেকে উঠে আসা ব্রিকোলাজ নয়, যেখানে অধস্তন গোষ্ঠী সচেতনভাবে নিজেদের স্টাইল দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হেবডিজের মডেলে ব্রিকোলার কাজ করে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু এখানে এই কর্তৃত্ব বা এজেন্সি (Agency) দাবি করা হয়নি, বরং আরোপ করা হয়েছে, মূলধারা যখন পাগলের মতো তাদের খুঁজতে শুরু করে তখনই তারা এই পরিচয়ে অভিষিক্ত হয়। স্টুয়ার্ট হল (Stuart Hall)-এর রিপ্রেজেন্টেশন (Representation) তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা এখানে একটি কন্টেইনমেন্ট ফেইলিউর (Containment Failure) বা নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা প্রত্যক্ষ করছি। মূলধারা যখনই গুপ্ত শব্দটিকে একটি স্থির, সহজপাঠ্য গালি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে, তখনই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। আর প্রতিবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সাথে সাথে শব্দটির গায়ে যুক্ত হয়েছে রহস্যের নতুন এক প্রলেপ। এই বিচ্যুতি আকস্মিক নয়, বরং কাঠামোগত। বাইনারি আনুগত্যের উপর নির্মিত একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, যেখানে আপনি হয় দৃশ্যমানভাবে আমাদের সাথে নয়তো সন্দেহজনকভাবে আমাদের বিরুদ্ধে, যেকোনো অস্পষ্টতাই প্রমাণ হয়ে যায়। এই গোপন স্বত্ত্বাকে উন্মোচিত করার জন্য যে ডিসকোর্স বা পাল্টাদৃশ্য তৈরি করা হয়, তা কেবল সেই রহস্যের মায়াজালকেই আরও বাড়িয়ে দেয়। আর সেই প্রমাণ যখন বারবার উচ্চস্বরে বলা হয়, তখন তা রূপ নেয় মিথ-এ। একসময়ের অভিযোগটি আজ নিঃশব্দে এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে, রোলাঁ বার্ত (Roland Barthes)-এর ভাষায় একটি দ্বিতীয়-ক্রম চিহ্ন (Second-Order Sign) এখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, কেন তারা এটি বলছে বা আসলে তারা কী খুঁজছে, তা আর জিজ্ঞাস্য নয়।
এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা একটি আমূল পুনর্নামকরণ বা রি-সিগনিফিকেশন (Re-signification) প্রত্যক্ষ করি। মূলধারা যখন স্প্রে পেইন্ট নিয়ে গুপ্তদের চিহ্নিত করতে মাঠে নামে, তখন তারা অজান্তেই একটি গালিকে এক চমৎকার উপসংস্কৃতিতে রূপান্তর করে ফেলে। এই রূপান্তর নিচ থেকে চালিত হচ্ছে না। এটি উপর থেকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে, নিরবচ্ছিন্ন এবং উন্মত্ত পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে। এই গতিশীলতার অদ্ভুত প্রতিভা হলো উভয় পক্ষই একই খেলায় মত্ত, প্রত্যেকে অন্যকে গুপ্ত হিসেবে চিহ্নিত করছে এবং প্রত্যেকেই সেই পৌরাণিক কাহিনীকে পুষ্ট করছে যাকে তারা আসলে ধ্বংস করতে চায়। উভয় পক্ষই যা খেয়াল করতে পারেনি, বা হয়তো পারছে না, তা হলো শব্দটি এখন তার মূল উৎস বা রেফারেন্ট (Referent) থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আজ যেকোনো পক্ষকে জিজ্ঞেস করুন গুপ্ত মানে কী, দেখবেন তারা দ্বিধায় পড়বে। গুপ্ত আর কোনো বাস্তব গোপন পরিচয়ের দিকে নির্দেশ করে না। এটি এখন নিজেই নিজের দিকে নির্দেশ করে। এটি এমন একটি সত্তা যা অন্ধকারে আবর্তিত হয়, উদ্বেগকে পুঁজি করে টিকে থাকে এবং নিজের গতিবেগ ছাড়া আর কিছুর ওপর নির্ভর করে না। চিহ্নটি (The Sign) তার নির্দেশিত বাস্তবতাকে (The Referent) আস্ত গিলে ফেলেছে।
আর এখানেই পরম পরিহাস। মূলধারা গুপ্ত কোড ভাঙার নেশায় এতটাই বুঁদ হয়ে আছে যে সেই গোপনীয়তা যা লুকিয়ে রাখার কথা ছিল তার চেয়েও বেশি আইকনিক হয়ে উঠেছে। টিকে থাকার জন্য শব্দটির এখন আর কোনো বাস্তব রহস্যের প্রয়োজন নেই। এটি নিজস্ব জীবন অর্জন করেছে। চোর-পুলিশের এই খেলায় প্রতিরোধ এখন আর সত্যের উন্মোচনে নেই, বরং প্রতিরোধ লুকিয়ে আছে এই চমৎকার ও বিব্রতকর সত্যের মধ্যে যে মূলধারা যা দেখতে পায় না, তা নিয়ে কথা বলা তারা থামাতেই পারছে না।
এখন একটু থমকে দাঁড়িয়ে ভাবা দরকার, আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক কল্পনা এই ‘গুপ্ত’ ক্যাটাগরির ভেতর আসলে কাদেরকে স্থাপন করেছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তি এবং তার অনুসারীদের স্থায়ীভাবে এই সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে কারণ তারা সবসময় কিছু লুকাচ্ছে তা নয়, বরং আমাদের প্রচলিত কাঠামোটি তাদের একটি সুপ্ত হুমকি (Latent Threat) ছাড়া অন্য কোনোভাবে দেখার জন্যই তৈরি হয়নি। আমাদের প্রভাবশালী সুশীল সমাজ, তাদের নরমেটিভ সেকুলারিস্ট (Secularist) প্রতিশ্রুতি নিয়ে, এই ফ্রেমিং তৈরির কাজটি সবচেয়ে দীর্ঘকাল ধরে করে আসছে, পরিকল্পিতভাবে গুপ্ত তকমাটিকে সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিকে গণতান্ত্রিক আলাপচারিতায় স্থায়ীভাবে অপাঠযোগ্য (Illegible) করে রাখা যায়। এই কল্পনায়, ‘গোপন থাকা’ নিজেই অগণতান্ত্রিক ইচ্ছার প্রমাণ হিসেবে তাত্ত্বিকায়িত হয়েছে। এখানে গোপনীয়তা আকস্মিক নয়, বরং একে একটি ‘আইডিওলজিক্যাল কনফেশন’ বা আদর্শিক স্বীকারোক্তি হিসেবে পড়া হয়। ফ্রান্ত্জ ফানো-র ভাষায়, এটি হলো এক ধরণের ‘সাইকোলজিক্যাল নেসেসিটি’ বা মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনে ‘অপর’ (The Other)-কে নির্মাণ করা। অর্থাৎ, প্রভাবশালী কল্পনা এই অদৃশ্য শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং নিজের প্রয়োজনে টিকিয়ে রাখার জন্যই তাকে বারবার তৈরি করে।
প্রভাবশালী নরমেটিভ সেকুলারিস্ট কল্পনার কাছে এই ফ্রেমিং একটি সাইকিক প্রোফাইল্যাকটিক (Psychic Prophylactic) বা মানসিক নিরোধক হিসেবে কাজ করে, যা তথাকথিত গণতান্ত্রিক স্বত্ত্বাকে র্যাডিকেল অপর (Radical Other) থেকে আলাদা করে রাখে। কিন্তু নিরোধক বা প্রোফাইল্যাকটিক কখনোই ততটা নিরাপদ নয় যতটা মনে করা হয়। যে দুশ্চিন্তাকে তারা চেপে রাখে, তা আরও জোরালো এবং অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ফিরে আসার পথ খুঁজে নেয়। সুতরাং ‘গুপ্ত’ স্রেফ একটি গালি নয়; এটি একটি স্ট্রাকচারাল পজিশন বা কাঠামোগত অবস্থান যা প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিজেই উৎপাদন করে এবং নিজের স্বার্থেই টিকিয়ে রাখে। এই গোপন সত্তাকে খুঁজে পাওয়া হয় না, বরং একে ‘ম্যানুফ্যাকচার’ বা উৎপাদন করা হয়। সুতরাং, এটি গোপন আবিষ্কৃত হয় না। এটি উৎপাদিত হয়।
এই বিষয়টি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ বিবাদ হয়ে থাকেনি কারণ শব্দটির অভিমুখ এখন বদলে যাচ্ছে। গুপ্ত শব্দটি ক্রমশ একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা চিন্তাক্ষেত্রের (discourse) অংশ হয়ে উঠছে, যা আংশিকভাবে ভূরাজনৈতিক সমীকরণের (Geopolitical Alignments) মাধ্যমে নির্ধারিত। এখানে ‘গোপন’ থাকা স্বত্ত্বা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং একটি ‘সভ্যতার সংকট’ এবং ‘ট্র্যান্সন্যাশনাল থ্রেট’(transactional Threat) বা আন্তঃদেশীয় হুমকি হিসেবে চিত্রিত হচ্ছে। আমাদের দেশীয় প্যারানয়াজাত “গুপ্ত” শব্দবন্ধনী এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ (War on Terror)-এর ব্যাকরণ ধার করে একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সাথে যুক্ত হয়েছে। যখন প্রভাবশালী সুশীল সমাজ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে গুপ্ত শব্দটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন তারা কেবল স্থানীয় অভিযোগ তোলে না। তারা এমন এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে যুক্ত হয় যেখানে গোপন ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন (Hidden Islamic Political Organization) হওয়া মানেই আন্তর্জাতিক হুমকি, আর আন্তর্জাতিক হুমকি মানেই নজরদারি, দমন এবং নির্মূলের বৈধতা। এই ফ্রেমে গুপ্ত হওয়া মানে স্রেফ দলীয় পরিচয় নয়, বরং এমন এক আনুগত্যের সন্দেহ যা সীমান্ত ছাড়িয়ে যায় এবং রাষ্ট্রের চেয়ে অন্য কিছুর কাছে দায়বদ্ধ। শব্দটি নীরবে রাজনৈতিক গালি থেকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বর্গে (Security Category) রূপান্তরিত হয়েছে। আর এই রূপান্তরের প্রভাব কোনো স্থানীয় নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী।
এর ফলে নিরাপত্তা তৈরি হয় না, তৈরি হয় প্যারানয়া। যার ফলাফল সমাজের নিরাপত্তাহানী। আর প্যারানয়া দীর্ঘস্থায়ী হলে এক সময় স্বয়ং স্রষ্টাকেই গ্রাস করতে শুরু করে। যে প্রভাবশালী নরমেটিভ কল্পনা গুপ্ত শব্দটিকে অস্ত্র বানিয়েছিল, তারা এখন বৈধ সন্দেহ আর নিজেদের উদ্বেগের মধ্যবর্তী সীমাটি খুঁজে পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিটি অস্পষ্ট রাজনৈতিক বিষয়ই এখন তাদের কাছে সম্ভাব্য গুপ্ত সত্তা। প্রতিটি নীরবতাই এখন তাদের কাছে স্বীকারোক্তি। এই মানসিক অস্থিতিশীলতা গুপ্ত ধারনাবর্গীয় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটিই তার যৌক্তিক গন্তব্য। যে সুশীল সমাজ একটি স্থায়ী অদৃশ্য শত্রুর ভয়ের ওপর ভিত্তি করে তাদের রাজনৈতিক ব্যাকরণ সাজিয়েছে, তারা চাইলেই হঠাৎ ভয় পাওয়া বন্ধ করতে পারে না। শব্দ তার কাজ করে ফেলেছে। সেই ক্ষতগুলো, সেই রহস্যময় ‘সিক্রেট’ বা গোপন সত্তার এর মতো নয়, বরং দিবালোকের মতো স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান। এই মিথলজি বা পৌরাণিক আখ্যান ‘গুপ্ত’ স্বত্ত্বারা তৈরি করেনি, করেছে তাদের শত্রুরা। আর এখন কেউ এটি ভেঙে ফেলতে পারছে না, কারণ সেখানে আসলে কী ছিল, তা নিয়ে কেউ আর একমত হতে পারছে না। যা নেই, তাকে পৌনঃপুনিকতার ভিতরে ধরতে গিয়ে, তা আরো ক্রমান্বয়ে পিছলে যাচ্ছে ক্রমশ। কিন্তু তারপরেও শব্দচিহ্নের শিকলে তাকে বাঁধতে গিয়ে যেই অর্থমন্ডলীর সাথে জুড়ে দেওয়া ছাড়া আর ধরা যাচ্ছে না, সেই অর্থমন্ডলী এমনই এক ব্যবস্থাকে চিহ্নায়িত করে, যার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার বিনাশের ফসলই আজকের এই অপশাসন মুক্ত বাংলাদেশ। ফলে “গুপ্ত” শব্দচিহ্ন ক্রমেই “রাজাকার” শব্দচিহ্নের সমার্থক (synonymous) হয়ে উঠছে সেক্যুলার নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকামীদের জন্যে আত্মঘাতী হয়ে উঠছে। তামাম দেশবাসীর জন্যেও নয়া সংকটের কারনে পরিনত হয়েছে।
