হাদি ফেনোমেনন: ইসলামায়িত বাংলাদেশে ইনসাফের সম্ভাবনা

ডঃ তানজিল সফিক

সহযোগী অধ্যাপক

শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য

সারসংক্ষেপ

এই প্রবন্ধের জন্মস্থান বাংলাদেশ, কাল ২০২৪ সালের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী লগ্ন। এই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সেক্যুলার-জাতীয়তাবাদী কাঠামোকে নাড়িয়ে দিয়েছে।  ইউনিভার্সাল এই কাঠামোর ভেতর দিয়েই আর সব কিছুর মত বাংলাদেশের মুসলিম অভিজ্ঞতাকেও রাজনৈতিকভাবে পাঠ করা হইত। ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে সেই কাঠামোটির পর্দা ছিঁড়ে বাংলাদেশের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, এমনকি ব্যক্তিমানুষের একটি প্লুরিভারসাল (pluriversal), ইসলামায়িত (Islamicate)  চরিত্র (character) ও চেহারা (appearance) সর্বসম্মুখে প্রকাশিত হয়ে উঠছে।  এই বাস্তবতা ঐতিহাসিকভাবে পললায়িত (historically sedimented)  , সামাজিকভাবে বহুমাত্রিক (socially multidimensional), এবং ইস্লামায়িত প্লুরিভার্সে সংগঠিত  - যাকে দীর্ঘকাল আড়াল করে রাখা হয়েছিল সন্দেহ (paranoia) , স্টিগমা (stigma)  আর জাতীয় নিরাপত্তার (national security) ওজরে।

এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে সামনে আসে শরীফ ওসমান হাদি , এমন এক পারসোনা (persona) যে তরুণ; মাদ্রাসাশিক্ষিত; স্বত:ষ্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থানে যেই সাধারণ জনতা রাজপথের রাজনৈতিক সংগঠক হয়ে উঠেছিল নিজেদের তাগিদে, সেই তাদেরই একজন; এবং শেষঅব্দি সে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের একজন প্রার্থীও বটে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু বিপুল জনসমাগম, গভীর শোক, এবং এক আন্তঃদেশীয় (transnational) স্বীকৃতির ভাষা তৈরি করে; এই ভাষার ভেতর তাঁকে শহীদ হিসেবে স্মরণ করা হয়।  

এই লেখাতে অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে হাদির উপস্থিতিকে/হাজিরাকে (presence/being) জনতুষ্টিবাদী(populist) বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক (individualistic) বোঝাপড়ায়, এমনকি স্রেফ জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক (representational) ঘটনা হিসাবেও আটকে রাখতে চাই না। হাদীকে “ইসলাম”, “মাদ্রাসা”, “যুবসমাজ”, বা “জনগণ”-এর প্রতিনিধি হিসেবে বুঝতে চাওয়ার বদলে এখানে তাকে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে একটি ফেনোমেনন (phenomenon) হিসাবে। “হাদী ফেনোমেনন” দাঁড়িয়ে আছে  বাংলাদেশের ইসলামিকেট বৌদ্ধিক, নৈতিক, এবং রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ অদৃশ্যকরণের (vanishing) বিরুদ্ধে এক প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এই অদৃশ্যকরণ ঘটেছে এক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক উদারনৈতিক (security-based liberal) দৃষ্টির (perspective) অধীনে। একইসঙ্গে, হাদীকে ঘিরে সৃষ্ট জন-প্রতিক্রিয়াকে এখানে পড়া হচ্ছে তাঁর ইনসাফ-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক উচ্চারণের সঙ্গে এক ধরনের নৈতিক-রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা হিসেবে। এখানে ইনসাফ কেবল উদারনৈতিক-আইনগত অর্থে জাস্টিস (Justice) নয়; বরং সঠিক সম্পর্ক (rightful relation), নৈতিক মাপ (ethical measurement), পারস্পরিক জবাবদিহি (reciprocal accountability), সংযম (moderation), এবং নির্বাচিত ন্যায়ের প্রত্যাখ্যানের(refusal of  selective justice) সমন্বয়ে সংগঠিত একটি বিশেষ  নৈতিক অভিমুখ (ethical directive/direction)।

বিশ্লেষণাত্মকভাবে, হাদীকে এখানে কন্সেপচুয়াল পার্সোনা  (conceptual persona)  হিসেবে দেখা হচ্ছে—যাঁর মাধ্যমে ইসলামায়িত বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন, অব্যক্ত স্তরগুলো সাময়িকভাবে একসঙ্গে ভাষা পেয়ে ওঠে: অভ্যুত্থান-পরবর্তী তরুণ আকাঙ্ক্ষা, সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ, শোক, শাহাদাত, নির্বাচিত ন্যায়ের সমালোচনা, এবং ইসলামের ভেতর থেকে রাজনৈতিক ভাষা উচ্চারণের সম্ভাবনা। প্রবন্ধটি যুক্তি দেয় যে ইনসাফ সেক্যুলার রাজনৈতিক ভাষার ধর্মীয় সম্পূরক নয়, এবং সর্বজাগতিক জাস্টিস (universal Justice)  স্থানীয় সাংস্কৃতিক রূপও (local cultural version) নয়। বরং এটি একটি বহুজাগতিক (pluriversal) নৈতিক-রাজনৈতিক ব্যাকরণ, যা ন্যায়, বহুত্ব, এবং সম্মিলিত জীবন কল্পনার মৌলিক শর্তগুলোকে পুনর্গঠিত করতে পারে।

প্রবন্ধটি আরও যুক্ত করে এক রাসূলীয় (prophetic/rasulean) রাজনৈতিক কল্পনা: মহানবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জননৈতিক জীবন থেকে আহরিত এক দিশা—তবে কোনো ধর্মতাত্বিক (theocratic) শাসন বা ইসলামিস্ট (islamist) রাষ্ট্র-প্রকল্পের নকশা হিসেবে নয়। বরং ক্ষমতার আগে আমানত, ভ্যানগার্ডিজমের (vanguardism) বদলে অঙ্গীকারমূলক সম্প্রদায়, এবং বিপ্লবী দখলের (revolutionary change) পরিবর্তে  দৈনন্দিন রূপান্তর (everyday transformation) - এক নৈতিক-রাজনৈতিক সম্ভাবনা ( ethical-political possibility) হিসেবে। শেষে প্রবন্ধটি প্রশ্ন রাখে: আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অসম্ভব অচলাবস্থার ভেতরে “ইনসাফের রাষ্ট্র” কি সম্ভব? নাকি ইনসাফ নিজেই আমাদের সম্মিলিত বহুজাগতিক জীবনের সবচেয়ে মৌলিক অনুমানগুলো পুনর্গঠনের দাবি জানায়?

১. ভূমিকা: অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে শুধু একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনকে নাড়িয়ে তোলেনি। এটি জনজীবনের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ভাষাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। বহু দশক ধরে বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে পড়ার যে প্রধান কাঠামো, তা গড়ে উঠছে এক শক্তিশালী সেক্যুলার-জাতীয়তাবাদী (secular-nationalistic) বন্দোবস্তের (settlement) ভেতর দিয়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই বন্দোবস্তের প্রধান ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক- দার্শনিক গাঠনিক উপাদানগুলো হল মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রীয় আধুনিকায়ন এবং সেই সাথে ইসলামায়িত জনজীবনের (public life) প্রতি সন্দেহ, যেন বুঝি ইসলামায়ন মানেই হইল কেবলই পশ্চাৎপদতা , জাতীয়তা-বিরোধিতা (anti-nationalism), সাম্প্রদায়িকতা , বিদেশি-প্রভাব, অথবা নিরাপত্তা-ঝুঁকি।

এই বন্দোবস্ত কখনোই পুরা বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারে নাই, বটম আপ তরিকায় মানুষ এই বন্দোবস্তকে কখনো সামনা-সামনি সমালোচনা করছে, কখনো পাশ কাটায় গেছে, কখনো একেবারে ডিঙ্গিয়েই গেছে, আবার কখনো কখনো স্রেফ ব্যবহারের খাতিরে ব্যবহার করছে, কিন্তু তাতে ঈমান আনে নাই। বাংলাদেশ কখনোই কেবল সেক্যুলার বা ধর্মীয়, আধুনিক বা ঐতিহ্যগত, বাঙালি বা মুসলিম, জাতীয়তাবাদী বা আন্তঃদেশীয় - এরকম এক লেবেলে আটকেছিল না। বাংলাদেশ সবসময়ই ছিল এমন এক ক্ষেত্র - যা ঘন, যা অসম, যেখানে নানা জীবন-জগৎ একে অন্যের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে, সংঘর্ষে জড়ায় , আবার একই সাথে পরস্পরকে গঠনও করে। গ্রামের মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার, এনজিও অফিস, গার্মেন্টস কারখানা, ছাত্রাবাস, মহল্লা কমিটি, অনলাইন ওয়াজ, রেমিট্যান্স অর্থনীতি, ক্রিকেট জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন-ভাষা, কোরআন-চক্র, বামপন্থী স্মৃতি, এবং বৈশ্বিক মুসলিম কল্পনা—এগুলো আলাদা আলাদা বাক্সে কখনই ছিল না। এগুলো একে অন্যের সাথে মিলেমিশে বাংলাদেশের জনজীবনের এক বুনন তৈরি করে।

রাষ্ট্র, মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়, এবং লিবারেল (liberal) নাগরিক সমাজের পছন্দসই বোঝাপড়ার মেইন্সট্রিম ব্যাকরণটি  যে বাংলাদেশের এই  সঘন চরিত্রটাকে প্রায়ই ধরতে ব্যর্থ হইছে তার কারণ হইল সন্দেহের বশে দেশের  ইসলামায়িত দিকগুলাকে হিসাবেরে বাইরে ফেলে রাখা;  অথবা স্রেফ অপরত্ব এবং শত্রুতার চোখে দেখা - যাকে ব্যবস্থাপনা, আধুনিকায়ন, সহনশীলতা, নিরাপত্তাকরণ, শিক্ষা-সংস্কৃতি ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে পোষ মানায় রাখতে হবে। তার নৈতিক ও বৌদ্ধিক জগৎকে কেবল ওদ্দূরই স্বীকৃতি দেয়া যাবে,  যতদূর গেলে এই প্রধান কাঠামোটিতে কোন অস্বস্তি - অসুবিধা না হয় - কিছু সাংস্কৃতিক চিহ্ন , ঐতিহ্য, দান, আধ্যাত্মিকতা, পরিচয়, ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ - এইই  বেশ। কিন্তু যখনই  ইসলামায়িত জীবন রাজনৈতিক উচ্চারণ, নৈতিক সমালোচনা, কিংবা জননৈতিক যুক্তি (পাবলিক ডিস্কোর্স) হিসেবে হাজির হইতে চায়, তখনই তাকে শোনার আগেই বিপজ্জনক হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

হাদী ফেনোমেননকে এই দীর্ঘ অস্বীকৃতি-কুস্বীকৃতির ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বুঝতে হবে।

শরীফ ওসমান হাদীর ডিসেম্বর ২০২৫-এর মৃত্যু শুধু আরেকজন রাজনৈতিক সংগঠকের মৃত্যু হিসাবে বাংলাদেশের মানুষ দেখে নাই, এক্সপেরিয়েন্স করে নাই। স্বীকৃত মেইন্সট্রিম ব্যাকরণের বাইরের একজন মানুষের মৃত্যুতে যে বিপুল জনসমাগম, যে গভীর শোক - আর সেটা এত জাত-পাত-বিভাজন-রাজনীতি-স্বার্থ সব ভেদ করে একই সাথে এত ধরনের এত সংখ্যক মানুষকে এফেক্ট করল - এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?  এটাকে এক নৈতিক ভাষার বিস্ফোরণ হিসাবেই কেবল ব্যাখ্যা করা চলে  - ব্যাকরণের পলকা নিয়মনীতির চেয়ে মানুষের অনেক গভীরে প্রোথিত যে ভাষা - তার এক উচ্চারণ। এই  ঘটনার গুরুত্ব শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না, বা কেবল হাদি কি করেছে বা বলেছে তা দিয়েও বোঝা যাবে না।  এর গুরুত্ব বোঝা যাবে তাকে ঘিরে যে জনমানুষের যেই স্বীকৃতি, তার ঘনত্ব ও বিস্তারের গভীরতা এবং ব্যাপকতার উপরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে। মৃত্যুর পর হাদী হয়ে ওঠেন এমন এক পারসোনা , যার মাধ্যমে অজস্র  বিচ্ছিন্ন উদ্বেগ ও বাসনা সবই একসঙ্গে উচ্চারণযোগ্য হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থানের বিশ্বাসঘাতকতা, সার্বভৌমত্বের অনিরাপত্তা, প্রান্তিক তরুণদের রাগ, এলিট লিবারেলিজমের প্রতি সন্দেহ, ন্যায়ের দাবি, নৈতিক রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা, এবং সর্বোপরি ইসলামায়িত  নৈতিক ভাষার জনজীবনে বৈধ ব্যাকরণ হিসেবে পুনরাবির্ভূত হয়।

এই প্রবন্ধ সেই ঘনীভবনকে বলছে হাদী ফেনোমেনন।

এখানে লক্ষ্য হাদীকে বীর (hero) বানানো নয়, বা তাকে রোম্যানটিসাইজ করাও নয়। আমি একদমই তাঁর ভালো বা মন্দ নিয়ে কথা বলছি না। উদ্দেশ্য তাঁকে বাংলাদেশের মুসলমান, মাদ্রাসা ছাত্র, কর্তৃত্ববাদবিরোধী তরুণ, কিংবা কোনো একক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি বানানো না , এমনকি সর্বজনীন কোন ফিগার বানানোও না। বরং হাদীকে সামনে রেখে এই প্রবন্ধ প্রশ্ন করতে চায় সেই প্রতিনিধিত্বমূলক যুক্তিকেই। হাদী গুরুত্বপূর্ণ এই জন্য নন যে তিনি কোনো "সম্প্রদায়ের", বা "সকলের", প্রতিনিধি। তিনি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাঁর পার্সোনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিল   সম্প্রদায়,অসম্প্রদায়, সকল, সর্বজনীন ইত্যাকার  সব ক্যাটাগরির অপ্রতুলতাকে , যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে বোঝানো হয়েছে। আর একই সাথে, খুব ক্ষণকালের জন্য হলেও, প্রতিভাত করে তুলেছিল বোঝাপড়ার ভিন্ন এক ভাষাকে। কি সেই ভাষা, যা অনুচ্চারিত কিন্তু এফেক্ট তৈরি করেছিল?     

এই প্রবন্ধে হাদী ফেনোমেনন পড়ার কেন্দ্রীয় ধারণা হলো ইনসাফ। কিন্তু ইনসাফকে খুব চট করে অনুবাদে, সংজ্ঞায় ধরা যাবে না।

২. খুব সহজ অনুবাদের সমস্যা

যদি ইনসাফ খুব দ্রুত জাস্টিস  হিসেবে অনুবাদ করা হয়, তাহলে তার অনেকগুলা  শক্তির জায়গা হারায় যায়। অনুবাদটা  পুরাপুরি ভুল না। অনেক প্রেক্ষাপটে ইনসাফ ন্যায়বিচার অর্থে যে জাস্টিস, তাই-ই বোঝায়। এটাও  ফেয়ারনেস, সঠিক বিচার, নৈতিক ভারসাম্য, এবং জুলুমের প্রত্যাখ্যান বোঝাতে পারে। কিন্তু, জাস্টিসের মত সহজ অনুবাদের  সমস্যা হইল যে এটা ইনসাফকে এমন এক পরিচিত লিবারেল ব্যাকরণের মধ্যে টেনে নেয়, যেখানে জাস্টিস সাধারণত অধিকার (rights), বণ্টন (distribution), স্বীকৃতি  (recognition), প্রসিডিউরাল ফেয়ারনেস (procedural fairness), প্রাতিষ্ঠানিক এডজুডিকেশন (institutional adjudication), অথবা আগে থেকেই গঠিত বান্দাদের (subject) মধ্যে দাবি-দাওয়ার ভারসাম্য হিসেবে কল্পিত হয়।

এসব উপাদান অপ্রয়োজনীয় না। এই প্রবন্ধ অধিকার, আইন, স্বীকৃতি, পুনর্বণ্টন, নাগরিকত্ব, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি প্রত্যাখ্যান করছে না। কিন্তু এগুলো ইনসাফের নৈতিক ঘনত্বকে পুরাপুরি ভাবে ধারণও করতে পারে না। ইনসাফ তার ভিতরে অন্য এক ধরনের চিন্তার অভিমুখ (orientation) বহন করে। এটা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্পত্তি (formal settlement) না ; বরং প্রত্যেকের নিজস্বতার অকৃত্রিমতা (authenticity), অনুপাত, নৈতিক ভারসাম্য, রিলেশনাল  জবাবদিহিতা (relational accountability) , এবং অন্যের হককে  বিকৃত না করার বাধ্যবাধকতা নির্দেশ করে। এটি কোনো পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থার ভেতর নানা রকমের চিন্তা ও ট্রুথ -ক্লেইমগুলার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ম্যানেজ করার মতবাদ মাত্র নয়। এট অন্যসকলের মধ্যে একের সঠিকভাবে, সম্পূর্ণ নিজস্বতা নিয়ে  দাঁড়ানোর এক পদ্ধতি। এই পার্থক্যটা ধরতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ।

ইনসাফ একারণে কেবল আইনি ব্যাপার না  - এটা  নৈতিক, মূর্ত  এবং রিলেশনাল। এটা অপরের মধ্যে নিজের অকৃত্রিম মাপকে ধরে রাখা, আবার একইসাথে মাত্রাতিরিক্ততাকে প্রত্যাখ্যান করা,  সিলেক্টিভ জাস্টিস (selective justice) কে  প্রত্যাখ্যান করা, এবং  সেই সাথেই শুধু নিজের পক্ষের বাইরে সকল অপরের  সাথেও পারস্পরিক নৈতিক জবাবদিহিতায় থাকার সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। এটা শুধু দূর থেকে অন্যকে বিচার করার প্রশ্ন নয়, সকলকে একই সার্বজনীনতায় আনার প্রকল্পও নয় (লিবারেলিজমের মত);  বরং এই সব আরোপিত কাঠামো ছাড়াও অন্যদের সঙ্গে পৃথিবী কীভাবে সহাবস্থান করা যায়, সেই প্রশ্ন।

এই অর্থে, ইনসাফ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিমূর্ত নীতি না। ইনসাফ বেঁচে থাকে জীবনযাপনের ভঙ্গি, ভাষা, দায়িত্ব, নৈকট্য, এবং সংযমে। এর জননৈতিক শক্তি আছে, কিন্তু তা মূলে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান থেকে জন্মায়ও না, তাকে কেন্দ্র করেও আবদ্ধ থাকে না । এটা মানুষের দৈনন্দিন নৈতিক চর্চা থেকে উঠে আসে, তার মাঝেই প্রকাশ-বিকাশ পায়।

বাংলাদেশের জন্য এটি গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে জাস্টিসের সংগ্রাম বহুবার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিকতা ও সাংস্কৃতিকতার হেজেমনি দখলের কোন্দল বন্দি হইছে, ট্রমায় পর্যবসিত হইছে। প্রতিটি পক্ষ নিজেদের মৃতদের স্মরণ করে এবং অন্যদের মৃতদের ভুলে যায়। প্রতিটি শাসন নিজেদের শহীদদের নাম দেয় এবং প্রতিপক্ষের শোককে অপরাধী করে। প্রতিটি আদর্শিক অবস্থান জাস্টিস দাবি করে, কিন্তু শত্রুর মুখোমুখি হলে সেই জাস্টিস স্থগিত রাখার অধিকারও নিজের কাছে রাখে। ফলে জাস্টিস আলাপের এর কোন ঘাটতি নাই; বরং যা  আছে তা অতিরিক্তই বলা যায়। বাংলাদেশ জাস্টিসের আলাপে এ পূর্ণ। যা অনুপস্থিত, তা প্রায়শই ইনসাফ: সঠিক মাপের শৃঙ্খলা, এমনকি যখন অন্যজন অস্বস্তিকর, প্রতিপক্ষ, অথবা রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল।

এখানেই হাদীর রাজনৈতিক ভাষার গুরুত্ব। বিষয়টি শুধু এই নয় যে তিনি জাস্টিস  দাবি করেছিলেন। অনেকেই জাস্টিস দাবি করে। বরং গুরুত্ব হলো ইনসাফ তাঁর ক্ষেত্রে এক বৃহত্তর জননৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে: এমন এক নৈতিকতা, যা বাংলাদেশের নানামুখী  রাজনৈতিকতা ও সাংস্কৃতিকতার ভেতরে জাস্টিস বণ্টনের চরিত্রকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়।

তাই হাদী ফেনোমেনন আমাদের জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য করে: ইনসাফ যদি justice-এর প্রতিশব্দ না হয়ে নিজস্ব ধারণাগত ব্যাকরণ হিসেবে ভাবা হয়, তাহলে কী ঘটে?

৩. প্লুরিভার্সাল (pluriversal)  ধারণা হিসেবে ইনসাফ

প্লুরিভার্স (Pluriverse) ধারণাটি এই অনুমানকে প্রশ্ন করে যে পৃথিবী একটিমাত্র সার্বজনীন বাস্তবতা, যেখানে কেবল ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি বসবাস করে। বরং এটি প্রস্তাব করে যে বহু জগৎ, বহু বাস্তবতা, বহু ধরনের হওয়া, জানার পদ্ধতি, অনুভব করার ধরন এবং পৃথিবীকে গড়ে তোলার ভিন্ন ভিন্ন উপায় একসঙ্গে সহাবস্থান করে। প্লুরিভার্স কেবল বৈচিত্র্যের উদযাপন নয় বা বহু সংস্কৃতিকে একই কাঠামোর ভেতরে জায়গা দেওয়ার আহ্বান নয়; বরং এটি বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কেই একটি মৌলিক অবস্থান। তাঁর মতে বাস্তবতা কোনো সম্পূর্ণ, স্থির বা একরৈখিক বিষয় নয়; এটি অসমাপ্ত, বহুবিধ এবং ক্রমাগত গঠিত হতে থাকা একটি প্রক্রিয়া। আধুনিকতার সেই ঔপনিবেশিক প্রবণতার বিপরীতে, যা একটি একক “এক-বিশ্বের বিশ্ব” (one-world world) তৈরি করতে চায় এবং সবকিছুকে এক ধরনের সার্বজনীন ভাষা ও মানদণ্ডের অধীনে নিয়ে আসতে চায়, প্লুরিভার্স আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিভিন্ন জগৎ আংশিক সংযোগ, ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং অবস্থানগত চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে, যেগুলো সবসময় একে অপরের ভাষায় পুরোপুরি অনুবাদযোগ্য নয়। ফলে প্লুরিভার্সের লক্ষ্য সবাইকে একই করে ফেলা নয়; বরং এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি করা, যেখানে ভিন্ন জগৎগুলো তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও পারস্পরিক সম্পর্ক, যত্ন, সংলাপ এবং সহ-অস্তিত্বের নতুন পথ নির্মাণ করতে পারে।

প্লুরিভার্সাল পাঠ ইনসাফকে তার নিজস্ব শর্তে ভাবতে সাহায্য করে। এর ফলে ইনসাফের ধারণাটা ইউনিভার্সাল জাস্টিসের একটা স্থানীয় সাংস্কৃতিক ভার্সন বা সেক্যুলার রাজনৈতিক ভাষার একটা  ধর্মীয় পারিভাষিক অনুবাদের মধ্যে আটকে যায় না , বরং তাকে দেখা যায় জটিল জীবনজগৎ (biosphere) , ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, এবং জননৈতিক চর্চা থেকে উদ্ভূত একটা উৎপাদনশীল (productive) ধারণা হিসেবে - যা আধুনিক (modern) প্রধান ক্যাটাগরিগুলোর মধ্যে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

ইনসাফের প্রশ্নটা তাই জাস্টিসের বিকল্প  সিলসিলার  (alternative justice traditions ) এর আর্কাইভের আরেকটা উপাদান যোগ করা প্রশ্ন না। তেমন হলে দুনিয়াকে বোঝাপড়ার প্রধান ব্যাকরণ  (dominant grammer) অক্ষত থেকে যায়। মাল্টিকালচারাল উপাদানের তালিকায় ইনসাফ আরেকটা আইটেম হিসাবে খালি যোগ হয়: লিবারেল জাস্টিস (liberal justice), রিস্টোরেটিভ (restorative justice), ইসলামিক জাস্টিস (Islamic justice), আদিবাসী জাস্টিস (indigenous justice), সোশাল জাস্টিস (social justice) ইত্যাদির মত । কিন্তু বিষয়টা আরও অনেক আলাদা। ইনসাফ হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যুক্তিতে কাজ করে, যার সূক্ষ্মতা প্লুরিভার্সের এপ্রোচ দিয়ে চিন্তা করলে ধরা যায়। 

প্লুরিভার্সিলিটি চিন্তার একক কন্টেইনার হিসেবে স্থির ক্যাটাগরিকাল উপাদানের দিকে ফোকাস করার বদলে বরং যেসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেটাফিজিকাল জগতগুলো গঠিত হয় (কখনোই পরিপূর্ণ ভাবে সম্পূর্ণ হয় না , কিন্তু ভাঙ্গন-গড়ন চলমান থাকে),  সেদিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে। এভাবে পড়লে ইনসাফ কেবল প্লুরালিটির মামলা না, এটা  pluriversal। এটি বহু জীবনজগৎ (biosphere)  ও  অস্তিতত্ব (ontology) এর মধ্যে  দায় (obligation) ও ন্যায়ের ধারণা, রীতি ও চর্চার বিজড়ণ (entanglement) - এরা সবাই একসঙ্গে বিদ্যমান, কিন্তু একে অন্যের মধ্যে বিলীন হচ্ছে না, ফলে কোন একক, ইউনিভার্সাল পাটাতনের দাবীও করা যাচ্ছে না।

ইসলামায়িত বাংলাদেশে ইনসাফকে বোঝা  যাইতে পারে ক্লাসিক্যাল ইসলামি ঐতিহ্য, কোরআনিক ও নববী নৈতিক দিগন্ত, পারস্য-উর্দু-বাংলা নৈতিক শব্দভাণ্ডার, vernacular speech, স্থানীয় আঘাতের ইতিহাস, পোস্টকলোনিয়াল রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, তাকওয়ার মূর্ত চর্চা, মহল্লার চর্চা, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, শোক, এবং দৈনন্দিন বিচারের অভ্যাস থেকে। কিন্তু আবার  এদের কোনোটাতেই ইনসাফের ধারণার  সীমা টেনে দেয়া যায় না। এটি এদের মাধ্যমে আসে, এদের অতিক্রম করে এবং এদের অতিরিক্ত হিসেবে বিরাজ করে। 

এখানে এটা বোঝাও  খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে প্লুরিভার্স এবং ইনসাফের সম্পর্ক ভিতর-বাহিরের সম্পর্ক না। প্লুরিভারস চিন্তার এমন  কোনো কাঠামো না যার ভেতরে ইনসাফের ধারণাকে রাখা যাবে। বরং ইনসাফ নিজেই একটি প্লুরিভারসাল উচ্চারণ  (articulation) । এটি বহু ট্রাডিশানকে এক জীবন্ত নৈতিক-রাজনৈতিক অভিমুখে ঘনীভূত করে, কিন্তু কখনও বন্ধ সিস্টেমে পরিণত করে না। এটি অন্যদের বিপরীতে দাঁড়ানো কোনো সীমায়িত সিলসিলার (bounded Tradition) সম্পত্তি নয়। আবার এটি কোনো ধর্মতাত্বিক ধারণাও   (theological concept) নয়, যা পরে রাজনীতিতে অনুবাদিত হয়। এটি জনজীবনে আসে বহু ঘন ও অসম সম্পর্কের মধ্যে সঠিকতা রচনার এক উপায় হিসেবে।

এখানে মাল্টিকালচারালিজম (multiculturalism)  থেকে পার্থক্যটা পরিষ্কার। মাল্টিকালচারাল লজিক বলতে পারে ইনসাফ কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জাস্টিসের কনসেপ্ট, যা অন্যান্য কালচারাল ভ্যালুজের পাশাপাশি স্বীকৃতির যোগ্য। কিন্তু এতে মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়। এমন পদক্ষেপ ইনসাফের পরিধিকে ছোট  করে নিয়ে এসে  তাকে ধর্ম (religion)  বা সংস্কৃতি (culture) লেবেল আঁটা কোন একটা বাক্সে রেখে দেয়। এতে ইনসাফকে কেবল ততদুর পর্যন্তই জায়গা দেয়া হয় , যতদূর পর্যন্ত তার কন্সেপচুয়াল শক্তি ইউনিভার্সাল পাটাতনের বাইরে বা বিরুদ্ধে যাইতে চায় না।   

একটি প্লুরিভারসাল  পাঠ ভিন্নভাবে কাজ করে। এটি জিজ্ঞাসা করে: ইনসাফ যদি নিজের ব্যাকরণে এ কথা বলতে পারে, তাহলে কী ধরনের জগত  (world) ও সম্পর্ক  (relation) কে   চিন্তায় আনা যায় ? এটি জিজ্ঞাসা করে: দায় (obligation) , জনজীবন (public life), এবং সহাবস্থান (coexistence)  সম্পর্কে ইনসাফ কী দেখায়, যা সেকুলার-লিবেরাল ক্যাটেগরিগুলা  ধরতে ব্যর্থ হয়েছে?

এখানে Martin Savransky-এর প্লুরিভারস-সংক্রান্ত কাজ বিশেষভাবে সহায়ক। তাঁর চিন্তা আমাদের ডমিন্যান্ট ট্র্যাডিশন (dominant traditions)  যেভাবে বাস্তবতা  (reality) কে বোঝে, তত্ত্বায়িত (thoerize) করে এবং সংগঠিত (organize) করে, তার বাইরে যা রয়ে যায়, তার প্রতি মনোযোগী হতে বলে। এই জন্য  প্লুরিভারস কেবল বর্ণনামূলক (descriptive) ব্যাপার না। এটি একটি নৈতিক (ethical)  এবং বৌদ্ধিক (intellectual) দাবী (demand)ও বটে। এটি এমন সব  মোডস অফ এক্সিস্টেন্সের (modes of existence) -এর প্রতি সংবেদনশীলতা (responsiveness) দাবি করে, যেগুলো এস্টাব্লিশড কন্সেপচুয়াল অর্ডার  (conceptual orders)  এ কোনো “যদি”, “কিন্তু” (remainder)  ছাড়া অনুবাদ করা যায় না। এটি আমাদের সেইসব কিছুর সঙ্গে এঙ্গেজ করতে বলে, যেগুলোকে আধুনিক রিজন রেসিডুয়াল, ইরর‍্যাশনাল, প্রি-পলিটিকাল বা অসম্ভব বানায় রাখছে। 

এই লেন্সে  ইনসাফ বাইরে থেকে অন্য কোনকিছুর সাপেক্ষে স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা কোনো ব্যাপার না। এটি নিজেই একটা  চিন্তার ধরন, যার একটা বিশেষ সক্ষমতা হইল স্বীকৃতির (recognition)  -এর শর্তগুলোকে প্রশ্ন করতে পারা।

যদি অধিকার (rights) , নাগরিকত্ব (citizenship) , আইন (law) , সার্বভৌমত্ব  (sovereignty) , স্বীকৃতি (recognition) - এই ক্যাটাগরিগুলো দিয়ে  চিন্তার শুরু করা হয়, তাহলে ইনসাফ সেকেন্ডারি, বা সম্পূরক, অথবা ওই সব টার্মে অনুবাদ-অনুধাবনের অপেক্ষায় থাকা কিছু একটা বলে মনে হয়। কিন্তু যদি প্লুরিভারসালি শুরু করা হয়, তাহলে ওই ক্যাটাগরিগুলো তাদের মনোপলি  হারায়। তারা দুনিয়াকে বোঝার বহু ঐতিহাসিক ব্যাকরণের (historical grammar)  এর একটি মাত্র হয়ে যায়। এই খোলা ময়দানে  ইনসাফকে আর ডিরাইভেটিভ নৈতিক ভকাবুলারি হিসেবে দেখা যায় না। এটি হয়ে ওঠে ভিন্ন ধরনের লজিকাল  অপারেশন (যৌক্তিক অনুজ্ঞা)। 

ইনসাফ বিমূর্ত ব্যক্তি (abstract individual) দিয়ে চিন্তার শুরু করে না। তার একক রিলেশনাল বিয়িং (relational being)। এদের মধ্যে কোন ইউনিভার্সাল প্রসিডিউর নিয়ে সে চিন্তাকে আগিয়ে নেয় না , তার  আগানোর মাধ্যম হইল সিচুয়েশনাল দায়বদ্ধতা (situational accountability) । জাস্টিসের শেষ অভীষ্ট  প্রতিষ্ঠান না, বরং এই বোধ যে ন্যায্যতা  লিভড , স্পোকেন , and এম্বোডিড হতে হয় এমনসব  সম্পর্কের মধ্যে, যা কোনো প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না।

এর অর্থ হলো ইনসাফ প্লুরিভার্সকে একটি বিশেষ নৈতিক অভিমুখ (ethical direction) দেয়। প্লুরিভারসালিটি  কখনও কখনও মাল্টিপ্লিসিটির  রোমান্টিক সেলিব্রেশান হয়ে ওঠার ঝুঁকি রাখে। কিন্তু শুধু মাল্টিপ্লিসিটি নিজে জাস্টিসের এর নিশ্চয়তা দেয় না। প্লুরিভার্সের জগতগুলার নিজের ভিতরে আবার পরস্পরের সহাবস্থানের মাঝেও ডমিনেশন, খারিজিয়ানা, সহিংসতা থাকতে পারে।  বিজড়ণ (entanglement) মাত্রই নিষ্পাপ নয়। তাই প্লুরিভার্সেরও নৈতিক ব্যাকরণ দরকার।

ইনসাফ এমন এক ব্যাকরণ দিতে পারে। এটা  শুধু জিজ্ঞাসা করে না যে বহু জগত (প্লুরিভার্স)  আছে কি না। বরং এটা জিজ্ঞাসা করে: এই জগতগুলা কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কার দ্বারা, কার খরচে, আর তাদের মধ্যের ব্যাল্যান্সটা কেমন? এটা সহাবস্থানের ক্ষেত্রে  অনুপাত (proportion) , দায়বদ্ধতা (accountability) , এবং নৈতিক পরিমাপ (moral measure) নিয়ে আসে।

মোদ্দা কথা এই যে প্লুরিভার্স  ইনসাফকে কেবল পারিভাষিক অনুবাদের  বাইরে চিন্তনযোগ্য করে তোলে , আর ইনসাফ প্লুরিভার্সকে নৈতিক ব্যাকরণ (ethical গ্রামার) দেয়। আরও একুরেটলি বললে প্লুরিভ্রার্স  যদি জীবনকে কে একটা একক ইউনিভারসাল জগতে নামিয়ে আনার অসম্ভবতাকে পরিষ্কার করে তোলে, তাহলে ইনসাফ সেই প্লুরিভার্সের এর মধ্যে সঠিকভাবে, নৈতিকভাবে  বেঁচে থাকার এক পথের নাম।

৪. নিরাপত্তাকেন্দ্রিক (security-centric) লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গী

হাদী ফেনোমেনন কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা বুঝতে হলে বুঝতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রে কোন ভ্যানিশিং এর প্রকল্পের বিপরীত তার আত্মপ্রকাশ হইছিল।

বাংলাদেশে ইসলামায়িত রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনকে প্রায়ই দেখা হয়েছে এক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক লিবারেল দৃষ্টির মাধ্যমে। এই দৃষ্টি লিবারেল এই অর্থে নয় যে এটি সহনশীল। বরং এটি নিজেকে সেই সেকুলার কর্তৃত্ব দেয়, যার মাধ্যমে ঠিক করা যায় ধর্মের কোন প্রকাশগুলো জনজীবনে এ এক্সেপ্টেবল - যা  আধুনিক, সংস্কৃতিবান , শান্তিপূর্ণ , ঊন্নন-সহযোগী , বা গণতান্ত্রিক হিসেবে প্রবেশ করতে পারবে। এটি নিরাপত্তায়িত (securtized), কারণ নির্দিষ্ট ইসলামায়িত স্পিচ, পোশাক, শিক্ষা বা মোবিলাইজেশনকে  এঙ্গেজ করার  আগেই সম্ভাব্য নিরাপত্তা-ঝুকি (security threat) হিসেবে দেখা হয়।

এই দৃষ্টি শুধু ধর্মের বিরোধিতাই করে না, এটি ধর্মকে ক্যাটাগোরাইজ করে। কিছু ইসলাম গ্রহণযোগ্য: চ্যারিটেবল ইসলাম, ফোক ইসলাম, হেরিটেজ ইসলাম, শান্তিবাদি ইসলাম, উৎসবের ইসলাম, প্রাইভেট ইসলাম, ডোনার-ফ্রেন্ডলি ইন্টারফেইথ ইসলাম, বিরাজনীতিকৃত সুফি নান্দনিকতা, সার্ভিসের নৈতিক মোটিভেশন হিসাবে ইসলাম ইত্যাদি।  অন্য কিছু ইসলাম সন্দেহজনকঃ মাদ্রাসার বয়ান, মসজিদ-ভিত্তিক রাজনৈতিক ক্রিটিক, ট্রান্সন্যাশনাল মুসলিম ঐক্যবোধ, সাম্রাজ্যবিরোধী ইসলামিক ভোকাবুলারি, শহীদি, পশ্চিমা লিবারেল হিপোক্রেসির সমালোচনা এবং ইসলামিক নৈতিক ক্যাটাগরিগুলো দিয়ে জনজীবন গঠনের দাবী।

এই ক্যাটাগরাইজেশনের ফলাফল সুগভীর । এটা একটা  শিক্ষিত লিবারেল 'কমন সেন্স'  তৈরি করেছে, যেখানে ইসলামায়িত জীবন সামজিক বাস্তবতা হিসেবে দৃশ্যমান, কিন্তু বৌদ্ধিক রিসোর্স হিসেবে গ্রহণযোগ্য না। তাকে নিয়ে নৃতাত্ত্বিক স্টাডি করা যায়, এডমিনিস্ট্রেটিভলি ম্যানেজ করা যায়, ভোটের হাতিয়ার বানানো যায়, সংস্কৃতিতে আটকায় রাখা যায়। কিন্তু নেশন এর জন্য কনসেপ্ট  উৎপাদনের অধিকার তাকে খুব কমই দেওয়া হয়।

মাদ্রাসাশিক্ষিত বান্দা (সাবজেক্ট) এই দৃষ্টির মধ্যে বিশেষভাবে জটিল অবস্থান দখল করে। তাকে প্রায়ই ডেফিসিয়েন্ট বা ডেঞ্জারাস হিসেবে কল্পনা করা হয়: তার আধুনিক শিক্ষা নেই, ক্রিটিকাল চিন্তা নেই, কসমপলিটানিজম নেই,  গণতান্ত্রিক সেন্সিবিলিটি নেই, অথবা তার মধ্যে উগ্রপন্থা সুপ্ত আছে। এমনকি যখন তাকে ইনক্লুড করা হয়, তখনও বেনিফিশিয়ারি , ডেমোগ্রাফিক, অবজেক্ট, রিস্ক - এইসব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাজনৈতিক চিন্ত্রার এর উৎপাদক হিসেবে তাকে খুব কমই দেখা হয়।

এই পটভূমিতেই হাদীর আবির্ভাব ডিজরাপ্টিভ হয়ে ওঠে। তাঁর গুরুত্ব কোন অর্গানাইজেশন বানানোর মধ্যে না, বা জীবনীকারের দৃষ্টিতে দেখলেও তা বোঝা যাবে না । তাঁর গুরুত্ব এইখানেই  যে তার পাবলিক প্রেজেন্স সমাজ-রাজনীতি-রাষ্ট্রে  বৈধতা (legitimacy) বণ্টনের (distribution)  স্বাভাবিক কোড গুলোকে ডিস্টাবিলাইজ করে তুলেছিল - গণঅভ্যুত্থানের পর একজন মাদ্রাসাশিক্ষিত তরুণ সংগঠক যে তার ইনহেরিটেড ক্যাটাগরির মধ্যে সহজে ফিট করেন না, যাকে ন্যাশনালিস্ট কল্পনার সেকুলার  ছাত্র বিপ্লবী হিসাবেও আঁটানো যায় না, সিকিউরিটি বয়ানের দাড়িওয়ালা থ্রেটও নন, আবার লিবারেল আপলিফটের অপেক্ষায় থাকা গরীব ধার্মিক বান্দাও নন।

তাঁকে সহজে ছকে বসানো যায় না। আর ঠিক এই কারণেই তিনি ফ্রেমের সীমানাকেই  প্রকাশ করে তোলেন। 

একারণেই হাদীর মৃত্যুকে ঘিরে জন-প্রতিক্রিয়াকে  শুধু সাধারণ শোক হিসেবে পড়া যাবে না। এটি স্বীকারযোগ্যতার (recognisability) যে লিবারেল ব্যাকরণ, তার রাপচার (rupture) হিসেবেও পড়তে হবে। বহু মানুষ হাদীর মধ্যে শুধু একজন নিহত এক্টিভিস্টকে দেখেনি; তারা দেখেছে সহিংস সংহারে শিকার এমন এক সম্ভাব্য রাজনৈতিক বান্দাকে (পলিটিকাল সাবজেক্ট), যাকে খুব কমই বৈধ হিসেবে হাজির হতে দেওয়া হয়েছে: ইসলামায়িত , তরুণ, নৈতিকভাবে শক্তিশালী , কর্তৃত্ববাদবিরোধী, পাবলিকলি আর্টিকুলেট, এবং এলিট ডিস্কোর্সের স্টেরেওটাইপ ভেঙ্গে ফেলা এক চরিত্র। 

এই কারণেই শহীদ হিসাবে হাদির স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।

৫. শাহাদাত ও জনস্বীকৃতি

শহীদ শব্দটিকে বাংলাদেশ শুধুই  ধর্মীয়  শব্দ হিসাবে দেখে না ।  অন্য অনেক  মুসলিমপ্রধান  সমাজের  মতই বাংলাদেশের সমাজেও এই শব্দটি ধর্মতাত্বিক, নৈতিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক এবং এফেক্টিভ (theological, moral, political, affective, এবং historical) শক্তি বহন করে। শাহাদত মৃত্যুর এক রূপের নাম, কিন্তু আরবির ব্যুৎপত্তির হিসাবে একই সঙ্গে শহীদ মানে সাক্ষ্যদাতাও। এই শব্দ ব্যক্তিগত শোককে জনগণের করে তোলে। এটি মৃত্যুকে স্রেফ ক্যাজুয়ালটির চেয়ে বেশি কিছুতে পরিণত করে তোলে। এটি দাবি করে যে এই  মৃত্যু আরও কোন সত্যেরও সাক্ষ্য - সেই সত্য হতে পারে আমাদের পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার লুকানো স্বরূপ।   

তাই শাহাদাত একটা বিপজ্জনক ভাষা, এবং সবসময়ই বিতর্কিতও। এটা কখনো আত্মদান, কখনো প্রতিশোধ, কখনো শুদ্ধি, কখনো বা পলিটিকাল এবসলিউটিজম-এর জন্য ব্যবহৃত হইতে পারে।  এটা মৃত্যুকে এমনভাবে উঁচু করার জন্য ব্যবহৃত হইতে পারে যাতে তার কোন ক্রিটিক দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। যেই শোক মানুষকে এক করে , শহীদি-বোধ শোকের সেই কমিউনিটিকে একটা কঠিন-হৃদয় এক্সক্লুশনারি কমিউনিটিতেও পরিণত করে তুলতে পারে। তাই এই প্রবন্ধ শাহাদাতকে  রোমান্টিসাইজ  করতেছে না। বরং এই জিজ্ঞাসাই শুধু  করতেছে যে ইতিহাসের এই বিশেষ ক্ষণে হাদী ঠিক কোন অনুমান থেকে, কোন বিচারে, কোন কনজেংচারে জনমানসে শহীদ হিসাবে নামাঙ্কিত হইছিল?   

হাদী ফেনােমেননে শাহাদাত যেন এমন এক স্বীকৃতির ভাষা কাজ করেছে , যখন অন্য আর সব শব্দ  অপ্রতুল, অপর্যাপ্ত হয়ে উঠেছিল সেই ফেনমেনোনকে ভাষায় ধরতে। এটি হাদীকে শুধু ভিকটিম, একটিভিস্ট, রাজনীতিবিদ, ভোটপ্রার্থী বা ইয়ুথ লিডার হিসাবে না; বরং এমন একজন হিসাবে শনাক্ত করতেছে যে এক গভীরতর ডিজর্ডারের এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই স্বীকৃতি সেকুলার ভাষা - 'পলিটিকাল মার্ডার' কে  অতিক্রম করে যায় । এটি শোককে এক নৈতিক মাত্রা দেয়।

আরও গুরুত্বপূণ হল এই যে মুহুর্তে  হাদীর মধ্যে দিয়ে শাহাদাত ইনসাফের সঙ্গে যুক্ত হয়। হাদীর মৃত্যু  জনসমক্ষে শুধু আর শোকের বিলাপ থাকে না; বরং তাঁর শাহাদত ইনসাফের মাঝে লুকানো  রাইট মেজারস, সঠিক পরিমাপের দাবিকে তীব্রভাবে দৃশ্যমান করে তোলে এই প্রশ্নঃ যে কাকে এই বিদ্যমান ব্যবস্থায় গোণায় ধরা হয়, কে  সুরক্ষা পায়, কার জন্য শোক করা হয়, কার মৃত্যুকে ব্যাখ্যা  দিয়ে হালকা করা হয়, কার রাগকে রোগ বানানো হয়, কার পলিটিকাল স্পিচ শোনার আগেই ডেঞ্জারাস বলে দাগিয়ে দেয়া হয়?

তাই হাদী ফেনােমননে শোক এবং একুইজেশন দুই-ই ঘনীভূত হয়ে ওঠে। তা জানতে চায় কী ধরেনর বাংলাদেশ হাদীর মত বান্দা (সাবজেক্ট) গঠন করে , জীবিত অবস্থায় তাকে পুরাপুরি স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়, আবার  মৃত্যুর পর তাকে  বিপুলভাবে চিনতে বাধ্য হয়?

এটি শুধু একক মানুষ হিসাবে হাদিকে নিয়ে প্রশ্ন না।  কোন শর্তে ইসলামায়িত নৈতিক জীবন  পাবলিক স্ফিয়ারে ভিজিবিলিটি পাইতে পারে, কখন সে দৃশ্যমান হয় - সেই প্রশ্ন।  

৬. কন্সেপচুয়াল পার্সোনা (conceptual persona) হিসেবে হাদী

বলে নেয়া ভালো, দেল্যুজীয় (Deleuze) চিন্তার কাঠামোয় একটি কন্সেপচুয়াল পার্সোনা কেবল কোনো চরিত্র, স্বতন্ত্র ব্যক্তি, বা লেখকের ছদ্মরূপ নয়; বরং এটি এমন এক গতিশীল অবয়ব যার মধ্য দিয়ে চিন্তা নিজেই চলাচল করে এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার সক্ষমতা অর্জন করে। কন্সেপচুয়াল পার্সোনা চিন্তার বাহক বা কার্যকরী শক্তি, যা ধারণাকে সম্ভব করে তোলে। এটি কোনো পূর্বনির্ধারিত পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং সম্পর্ক, চলাচল, সাক্ষাৎ এবং হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উদ্ভূত হয়। তাই একে কোনো স্থির সত্তা হিসেবে বোঝা যায় না, যার একটি অপরিবর্তনীয় কেন্দ্র আছে; বরং এটি বহু ধরনের উপাদান—অনুভূতি, দেহ, ইতিহাস, বস্তুগত অবস্থা, চর্চা, ভাষা এবং সম্পর্ক—দিয়ে গঠিত একটি অস্থায়ী বিন্যাস, যা ক্রমাগত সংযোগ ও রূপান্তরের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। ফলে একটি কন্সেপচুয়াল পার্সোনা পৃথিবীর বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করে না; বরং পৃথিবীর প্রবাহ ও গতিশীলতার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় এবং একই সঙ্গে চিন্তার নতুন সম্ভাবনা তৈরিতেও অংশগ্রহণ করে। তাই এখানে মূল প্রশ্ন “এই ব্যক্তি কে?” নয়; বরং “কোন ধরনের সম্পর্ক, শক্তি এবং সক্ষমতা এখানে একত্রিত হয়েছে, এবং এর মাধ্যমে কী ধরনের চিন্তা সম্ভব হয়ে উঠছে?”

আশা করি এইটা পরিষ্কার যে, হাদীকে কন্সেপচুয়াল পার্সোনা (conceptual persona) হিসেবে পড়তে চাওয়াটা তাঁকে মিথোলোযাইজ করা না। হয় জীবনীকারকের দৃষ্টিতে, নয়তো কোন ধারণার প্রতিনিধিত্বশীল ফিগার হিসাবে কোন ব্যক্তিকে পড়ার তরিকার বাইরে আরেক ভাবে কাউকে বোঝার চেষ্টার একটা উপায় হইল এটা। এটা কোন ব্যক্তির নিজের আইডিয়া বা চিন্তার ব্যাপার না, বরং কোন একটা প্রবলেম কিভাবে একজন ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে ঘনীভুত হয়ে ওঠে, চিন্তাগ্রাহ্য হয়ে ওঠে - সেই মামলা।

এই প্রবন্ধে হাদীকে ইনসাফের ধারণার অরিজিন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তাঁকে ইসলামায়িত বাংলাদেশের কোন একক বা অন্যতম অথেন্টিক, প্রতিনিধিত্বশীল ভয়েস হিসেবেও দেখা হচ্ছে না। সেভাবে দেখতে যাওয়াটা বরং বিশ্লেষণাত্মকভাবে দুর্বল এবং নৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হবে। হাদীকে দেখা হচ্ছে এমন এক ফিগার হিসেবে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জীবনের বহু স্তর এক বিশেষ ক্ষণে একই সঙ্গে উচ্চারণ যোগ্য হয়ে উঠেছিল: অভ্যুত্থান, মসজিদ, মাদ্রাসা, তরুণ আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ, এলিটবিরোধিতা, শোক, শাহাদাত, এবং এমন এক রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা, যা কেবলই ডমিনেশনে পর্যবসিত হবে না।

তাই হাদী ফেনোমেনন একা হাদীর ব্যাপার না, ব্যক্তি হাদীর ব্যাপারও না, বরং তাঁকে ঘিরে যে জন-অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, সেই আলাপ।

হাদীকে ঘিরে জন-প্রতিক্রিয়াকে সহজেই দু’ভাবে ভুল পড়া যায়। একটা হল পপুলিস্ট রিডিং যা তাঁকে জনগণের পিওর এমবডিমেন্ট বানাতে চাইবে। আরেকটা হল সিকিউরিটাইজড লিবারেল রিডিং যা সেই একই ঘিরে প্রতিক্রিয়াকে বিপজ্জনক ধর্মীয় আগ্রাসনের প্রমাণ বানাবে। দুইটা পাঠই অপ্রতুল। দুইটা পাঠই দ্যেলুজের ভাষায় ফেনোমেননকে (phenomenon) ফ্যামিলিয়ার অব্জেক্টে (familiar object) নামিয়ে আনে।

সেস্থলে কন্সেপচুয়াল রিডিং (Conceptual reading) বরং এই জিজ্ঞাসা করে যে হাদীর মাধ্যমে কোন প্রবলেমটা চিন্তাগ্রাহ্য হয়ে উঠল?

এই প্রবন্ধ যে উত্তর প্রস্তাব করে, তা হল এই - হাদী ফেনোমেনন বাংলাদেশে এমন এক ইসলামায়িত জন-নৈতিকতা (public ethic), এমন এক চেপে রাখা সম্ভাবনাকে দৃশ্যমান করে তুলেছিল, যা সেকুলার জাতীয়তাবাদে সীমাবদ্ধ নয়, আবার ধর্মের রাষ্ট্র-দখল বাসনাতেও সীমিত নয়। তাঁর ফিগার এই প্রশ্নটাকেই চিন্তায়, ভাষায়, উচ্চারণে মূর্ত করেছিল যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক জীবন (political life) কি ইসলামায়িত নৈতিকতার ব্যাকরণ থেকে কল্পনা করা যায় - কোন লিবারালাইজেশন বা সিকিউরিটাইজেশন ছাড়াই? একে অন্য কোন নৈতিক ব্যাকরণে অনুবাদ না করেই?

এই-ই হাদীয় ইনসাফ।

হাদীয় ইনসাফ কোনো ডক্ট্রিন না, হাদীর সম্পত্তি না; পার্টি প্লাটফর্ম, ধর্মতাত্ত্বিক সিস্টেম, রাষ্ট্রপ্রকল্প - এগুলার কিছুই না। এটা এমন এক রাজনৈতিক সম্ভাবনা, যা তাঁর ফিগারকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল। সেই রাজনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্রই হল সেই ইহসান, যাতে আছে রিলেশনাল ন্যায্যতা, পাবলিক জবাবদিহিতা, নৈতিক প্রোপর্শনালিটি; যা সিলেক্টিভ জাজমেন্টের প্রত্যাখ্যান। ইসলামায়িত জীবনের ভেতর থেকে এর উচ্চারণ, কিন্তু তা সাম্প্রদায়িক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ না।

তাই হাদীয় ইনসাফ সংকীর্ণ বিচারে ইসলামিক জাস্টিস না। এটি বাংলাদেশের সহস্র জড়ন-বিজড়নের যাপিত জনজীবন থেকে উদ্ভূত একটি প্লুরিভার্সাল রাজনৈতিক নৈতিকতা (political ethics)।

৭. মসজিদের ভেতর থেকে কথা বলা

হাদীর ইলেকশন কাম্পেইন শুরু হইত প্রতি ভোর এ, ফজর এর নামাজ এর পর, মসজিদ এর বাইরে। একেক দিন একেক মসজিদ। এটা এক সৎ বান্দার ইবাদত নাকি পলিটিকাল স্টান্টবাজি, সেটা জানার দরকার নাই আমাদের এই প্রবন্ধের জন্য। যেটাই হোক, এই মসজিদ থেকে, নিজের ব্যক্তি চর্চার জায়গায় সমুন্নিত রেখে, হাদীর এই রাজনীতি আরেকটু গভীর ভাবে পড়া যায়। তাই প্রবন্ধের আরেকটা মেথডলিজিকাল প্রোভোকেশন হল এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই “মসজিদের ভেতর থেকে কথা বলে”।

এর মানে এই নয় যে প্রবন্ধটি শুধু মুসলমানদের উদ্দেশে কথা বলে। কোন ধর্মতাত্ত্বিক বোঝাপড়ার দাবিও তা করে না। ক্রিটিকাল থটের জায়গায় কোন রিলিজিয়াস অথোরিটিকে বসানোও এর মোক্ষ না। এর মানে অন্য কিছু। এর মানে হলো সেই প্রত্যাশাকেই প্রত্যাখান করা যে যেকোন পলিটিকাল ক্রিটিককে লেজিটিমেট হিসাবে গ্রাহ্য হইতে হলে আগে ধর্মীয় জীবন থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং অন্য কোন দোহাইয়ে আসতে হবে।

আধুনিক সেকুলার রিজন অনেক সময় ধর্মকে পাবলিক স্পিচ করতে দেয় শুধু তখনই, যখন তা নন-রিলিজিয়াস শব্দে চেহারা পালটে আসে। ক্রিশ্চিয়ান কমপ্যাশন ঢোকে সেকুলার ওয়েলফেয়ার  হিসেবে। যাকাত ঢুকবে তখনই যখন সে হবে রিডিস্ট্রিবিউশান। উম্মাহ ঢোকে ট্রান্সন্যাশনাল ঐক্য হিসেবে। সবর ঢোকে রিজিলিয়েন্স হিসেবে। শূরা ঢোকে অংশগ্রহণ হিসাবে। ইন্সাফ ঢোকে জাস্টিস নামে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই কনসেপ্টটি acceptable হয় কেবল তখনই, যখন তা সেকুলার মডার্নিটিতে আগে থেকেই অনুমোদিত ব্যাকরণের কাছাকাছি কোন ধারণায় রূপান্তরিত হয়ে আসে।

মসজিদের ভেতর থেকে কথা বলার মানে এই একমুখী অনুবাদ নির্ভর চিন্তাকে ডিজরাপ্ট করা।

এখানে মূল জিজ্ঞাস্য এই যে ইসলামিয়ত কনসেপ্টগুলা কি কেবলই কাঁচামাল, সেকুলার রিফাইনমেনটের আগে পাতে পড়ার যোগ্য না? মসজিদ কি শুধু ইবাদত, শৃংখলা, ধার্মিকতা, পুরুষতান্ত্রিকতা, সামাজিক মোবিলাইজেশনের জায়গা? নাকি এটা রাজনৈতিক চিন্তাগঠনের স্থানও বটে? সেখানে যেই নৈতিক ভাষা গড়ে ওঠে সেটা কি কেবলই প্রাইভেট বিশ্বাসের ব্যাপার, নাকি এক ধরনের পাবলিক রিজনও? ইনসাফকে জাস্টিসে অনুবাদ করাটাই কি খালি কাজ, নাকি ইনসাফ যাতে জাস্টিসকে প্রশ্ন করতে পারে, সেটাই কাজ?

অনুবাদের অনিবার্যতা অস্বীকার্য। বাংলাদেশ নিজেই বহুমাত্রিক অনুবাদের এর এক উর্বর ক্ষেত্র: আরবি, ফার্সি, বাংলা, ইংরেজি, উন্নয়ন-পরিভাষা, রাষ্ট্রের আইনি ভাষা, কোরানের তেলাওয়াত, সোশাল মিডিয়ার স্লোগান, গ্রাম্য টান, এনজিও রিপোর্ট, কোর্ট, রাস্তার শব্দ - এসবই ক্রমাগত একে অন্যের মধ্য দিয়ে চলাচল করতেছে। সমস্যা অনুবাদ নয়। সমস্যা হল একপাক্ষিক অনুবাদ -  এই অনড় দাবি যে ইসলামায়িত কনসেপ্ট সবসময় সেকুলার-লিবারেল স্বীকৃতির এর দিকে যাত্রা করবে, অথচ সেকুলার-লিবারেল কন্সেপ্টগুলা খুব কমই ইসলামায়িত ক্রিটিকের সামনে হাজির হইতে রাজি হবে।

মসজিদের ভেতর থেকে কথা বলা মানে এই দাবীকের উল্টে দেওয়া।

এজন্যই এটা জিজ্ঞাসা করা যথেষ্ট না যে ইনসাফকে জাস্টিস দিয়ে অনুবাদ করে সমাজ-রাজনীতি সহ জনজীবনের সব জায়গায় কাজ চালিয়ে দেয়া যায় কি না। জাস্টিস কি ইনসাফের জিজ্ঞাসা সহ্য করতে পারে কি না - এই হল আসল প্রশ্ন। দায় তো শুধু এটা না যে ইসলামকে গণতন্ত্রের সাথে মেলানো যায় কি না; দায় তো এটাও জিজ্ঞাস করা যে গণতন্ত্র ইসলামায়িত জনজীবনের নৈতিক চাহিদা মিটাইতে পারে কি না। রিলিজিয়াস স্পিচকে জনজীবনের জন্য কিভাবে স্যানিটাইজ করা যায় এটাই তো একমাত্র জিজ্ঞাসা হইতে পারে না; রিলিজিয়াস স্পিচের যেই নৈতিক ঘনত্ব, তাকে বাদ দিয়ে সেই জনজীবন নিজেই দরিদ্র, কমজোরি হয়ে গেছে কি না - সেই প্রশ্নটাও তো করতে হবে।

বাংলাদেশে এটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মসজিদ এখানে জনজীবনের বাইরে নয়। মসজিদের ভিতর থেকে যে স্বর আসে, তা বাংলাদেশের ভাষায়, স্মৃতিতে, এফেক্ট (affect) এ, সংস্কারে, দানে, শোকে, আত্মীয়টায়, মোবিলাইজেশনে, নৈতিক জাজমেন্টে  - জনজীবনের প্রতিটি কোণাঘুপচির সাথে জড়িয়ে আছে - আরো অনেক অনেক স্বরের সাথেই। এগুলা বাদে কোন রাজনীতিই হয় না। তাহলে এটা তো আর প্রশ্ন থাকতে পারে না যে ইসলাম রাজনীতিতে প্রবেশ করবে কি না, সে তো আছেই আগে থেকেই, অবিচ্ছেদ্য ভাবেই। আসল প্রশ্ন হলো আমরা কি তার উপস্থিতিকে রোমান্টিসাইজ বা স্যানিটাইজ না করে যথোপযুক্তভাবে চিন্তাগ্রাহ্য করে তোলার মতো কনসেপচুয়াল হাতিয়ার বানাইতে পারছি কি না?

৮. বিপ্লবী দখলের বাইরে রাসূলীয় কল্পনা

রাজনৈতিক রূপান্তর কল্পনারও একটা ব্যাকরণ থাকে। হাদীয় ইনসাফ বাংলাদেশের জন্য সেই রাজনৈতিক রূপান্তর কল্পনার জন্য যে প্রধান ব্যাকরণ  (dominant grammar), তাকেও ডিস্ট্যাবেলাইজ করে তোলে। এই ডমিন্যান্ট শুধুই লিবারেল না, বৈপ্লবিকও। এই কল্পনায় রাজনৈতিক মুক্তি আসে রাপচার (rupture)  এর মাধ্যমে - রেজিমের পতন, রাষ্ট্র দখল (state capture), শত্রুর পরাজয়, প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধিকরণ, এবং ডিসাসিভ দখলের মাধ্যমে নতুন অর্ডারের সূচনা।

এটিকে লেনিনসুলভ কল্পনা বলা যায়, যদিও সংকীর্ণ অর্থে লেনিনিজম না। বরং এটি একটি ওয়াইডার রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশান - ভ্যানগার্ডিজাম (vanguardism), হিরোইক বিরোধিতা, কেন্দ্রীয় কমান্ড, রাপচারের রোমান্টিক আপিল, এবং ক্ষমতা জয়ের পরে নৈতিক পরিবর্তন আসবে, এইসব ধারণা ও বিশ্বাসের সমষ্টি।

বাংলাদেশ এই ব্যাকরণ ভালো করেই জানে। তার রাজনৈতিক ইতিহাস গঠিতই হইছে স্বাধীনতা সংগ্রাম, ক্যু, গণ আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, তত্ত্বাবধায়ক ট্রাঞ্জিশন, পার্টি দখল (capture), রাজপথের সংগ্রাম, এবং নবজাগরণের পৌনঃপুনিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এই মুহূর্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ, এদেরকে অবহেলার কথা বলা হইতেছে না। রাপচার ছাড়া শিকড় ছড়ানো ডমিনেশন অক্ষতই থেকে যায় প্রায়শ। কিন্তু সে একাই যথেষ্ট না। ডমিনেশন উৎখাতের আকাঙ্ক্ষার সাথে ক্ষমতা অধিকার করার আকাঙ্ক্ষাও জোড়ায় থাকতে পারে, যে কারণে অথোরেটিরিয়ানিজম-বিরোধি রাজনীতি ফের সেই একই কমান্ড কাঠামোই পুনরুৎপাদন করতে পারে । লিবারেশন হয়ে পড়ে স্রেফ আরেকটা ক্যাপচার।

এখানেই ইনসাফ খুলে দেয় এক রাসূলীয় রাজনৈতিক কল্পনার দিক।

Rasulesque বা রাসূলীয় বলতে কোন ধর্মতাত্ত্বিক ব্লুপ্রিন্টের কথা বলা হইতেছে নয়া, বা ইসলামিক রাষ্ট্রপ্রকল্পের কথাও না। মহানবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবন ও জননৈতিকতা থেকে আহরিত এক নৈতিক রাজনৈতিক ওরিয়েন্টশনের কথাই এখানে বোঝা হচ্ছে, যেখানে কর্তৃত্ব থেকে আস্থা বিচ্ছিন্ন নয়, কমিউনিটি যেখানে ভ্যানগার্ডিজমের বদলে চুক্তির (covenant) এর মাধ্যমে গঠিত হয়, এবং যেখানে রূপান্তর শুধু রাপচারের উপরে নির্ভর করে না, প্রত্যেক দিনের নৈতিক শৃংখলার উপরেও একই ভাবে নির্ভর করে।

এই কল্পনার প্রথম উপাদান হলো ক্ষমতার আগে আমানত। মহানবী (স) এর পাবলিক অথোরিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ববর্তী নৈতিক ক্রেডিবিলিটির উপরে: রাজনৈতিক নেতা হওয়ার আগেই তিনি আল-আমিন - বিশ্বস্ত - হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এটি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে উল্টে দেয়, যেখানে আগে ক্ষমতা দখল করা হয়, আর নৈতিক রূপান্তর স্থগিত থেকে যায় বিজয়ের পরের দিনের জন্য। একটি রাসূলীয় কল্পনা এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় যে রাজনৈতিক এক্টর, আন্দোলন, এবং প্রতিষ্ঠানগুলা কীভাবে দায়িত্ব দাবি করার আগে দায়িত্বের যোগ্য হয়ে ওঠে?

হাদীর সঙ্গে পড়লে ইনসাফ শুধুই রাষ্ট্রের কাছে দাবির ব্যাপার না; এটা সকল রাজনৈতিক বান্দার উপর আরোপিত মেজার। কে দায়িত্বের যোগ্য? কে কমান্ডের আগে আত্মসংবরণ করে দেখিয়েছে? কে ক্ষমতাকে ধরে রাখতে পারে ক্ষমতা-মাতাল না হয়ে? কে জাস্টিফাইড ক্ষোভের ক্ষেত্রেও সিলেক্টিভ জাস্টিসের সহজ রাস্তায় না বলতে পারে?

দ্বিতীয় উপাদান হলো ভ্যানগার্ডিজমের বাইরে কোভ্যানেন্টাল কমিউনিটি। লেনিনসুলভ কল্পনা প্রায়ই ধরে নেয় যে একটা ভ্যানগার্ড গোষ্ঠী থাকতে হবে, যারা জনগণের পক্ষে কথা বলতে পারে এবং তাদের মুক্তির দিকে নেতৃত্ব দিতে পারে। রাসূলীয় কল্পনা শুরু করে সম্পূর্ণ অন্য জায়গা থেকে - পারস্পারিক সম্পর্ক গঠন, পরামর্শ, সুরক্ষা, মিউচুয়াল অবলিগেশন, এবং প্লুরাল সহাবস্থানের মাধ্যমে নৈতিক ও সিভিক কমিউনিটি গঠনের তাগাদা থেকে।

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য এই চিন্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা শুধু অথোরেটিরিয়ানিজমকে সরানো নয়। সমস্যা হলো বহু বছরের পারস্পারিক সন্দেহ, অপমান, দলীয় দখল, নিরাপত্তায়িত বিভক্তি, এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থার পর একটা শরিকানার সামাজিক পরিসরকে পুনর্গঠন করা। এই অর্থে ইনসাফ ডিস্ট্রিবিউটিভ হওয়ার আগে কোভেন্যান্টাল। এটি জিজ্ঞাসা করে: ভিন্ন জীবনগুলো কীভাবে সঠিক সম্পর্কে রাখা যায়, তাদের একক  কোন আদর্শিক ক্যাম্পের অন্তরীণ না করে?

তৃতীয় উপাদান হলো গ্লোরিয়াস রাপচারের বাইরে দৈনিক রূপান্তর। পরিবর্তনের রাসূলীয় মডেল কোনো একক বৈপ্লবিক ইভেন্টে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটা একটা ক্রম-বিকাশমান প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবর্তন আসে ধৈর্যশীল প্রতিষ্ঠান গঠন, নৈতিক শৃংখলা, সমাজ সংস্কার, বিজয়ের পরে আত্ম-সংবরণ এবং দরদ, সেবা, জাস্টিস, জবাবদিহিতার নৈমিত্তিক প্রাক্টিসের মধ্যে দিয়ে।

এটি জরুরি, কারণ রোমান্টিক বৈপ্লবিক চিন্তায় স্পেক্টেকুলার মুহূর্তগুলাই প্রাধান্য পায় - অভ্যুত্থান, পতন, স্লোগান, দুঃশাসনের অবসান ইত্যাদি। কিন্তু ইনসাফের কাজ শুরু হয় এসবেরও আগে, এবং পরে। এটি আছে নৈমিত্তিক দুর্নীতিকে না বলায়, প্রাত্যহিক অপমানকে না বলায়, সিলেক্টিভ শোককে না বলয়ায়, প্রতিপক্ষকে বিমানবিকরণের সুযোগকে না বলায়, আর টেকসই সমাজকাঠামো গঠনের ধৈর্যে।

তাই রাসূলীয় কল্পনা হাদীয় ইনসাফের অর্থকে গভীর করে। এটি দেখায় যে ইনসাফ কেবল কিছু ঘোষিত নীতির বিষয় না; এটা সংবরণের শৃঙ্খলা। এটি রাষ্ট্র থেকে আদায় করা সুফল-মাত্র নয়; বরং খোদ রাজনৈতিক পরিগঠনেরই একটা বিশেষ মোড, যার মাধ্যমে বান্দা, প্রতিষ্ঠান, এবং কমিউনিটি একে অন্যের কাছে দায়বদ্ধ হয়।

হাদীয় ইনসাফ শুধু জিজ্ঞাসা করে না ক্ষমতা জয়ের পর জাস্টিসের দাবি কী। এটি জিজ্ঞাসা করে: ক্ষমতা ডমিনেশনে পরিণত না হতে হলে কী ধরনের বান্দা, কমিউনিটি, এবং রাজনৈতিক বাসনা আগে গঠিত হতে হবে?

৯. সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় ব্যতিক্রম (exception) এর তত্ত্বের বাইরের বাংলাদেশ

প্রশ্নটি তাই বাংলাদেশ বেশি ধর্মীয় হবে নাকি বেশি সেক্যুলার হবে, এরকম সরল-সোজা নয়। এই বাইনারি ক্লান্তিকর। এটি অতিরিক্ত ভুল-শনাক্তি (misrecognition) তৈরি করেছে।

সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ প্রায়ই বাংলাদেশের মুসলিমনেসকে শাসন করে বাংলাদেশকে নিরাপদ করতে চেয়েছে। ধর্মীয় মেজরিটিরিয়ানিজম আবার বাংলাদেশের প্লুরালিজমকে শাসন করে বাংলাদেশকে নিরাপদ করতে চায়। দুটোই এই জাতির সব সমস্যা একবারে সমাধান করে চূডান্ত বন্দোবস্তে পৌছানোর আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বন্দি । দুটোই ভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে তখনই, যখন নিজের ব্যাকরণ অন্য আর সবার উপরে শেষ বিজয় পাবে।

একটি প্লুরিভার্সাল ইসলামায়িত পাঠ এই বন্দোবস্তকে প্রত্যাখ্যান করে।

এটি বাংলাদেশকে রাজনৈতিক কমিউনিটি হিসেবে অস্বীকার করে না। আবার জাতিকে কোনো অস্পষ্ট সভ্যতার পরিসরেও বিলীন করে না। বরং জিজ্ঞাসা করে: বাংলাদেশকে কি একটা প্লুরিভার্সাল পরিসর হিসেবে বোঝা যায় - এমন এক স্থান, যেখানে বহু জীবন-জগত (lifeworld) সবসময় সহাবস্থান করে, একে অন্যের সাথে ধাক্কা খায়, অভারল্যাপ করে, এবং এইভাবেই সংগঠিত করে একে অপরকে, কিন্তু কখনোই একক জাতীয়তার ধাতে (essence) পুরোপুরি নামিয়ে আনা যায়নি?

এই কারণেই “ইসলামায়িত বাংলাদেশ” (Islamicate Bangladesh) শব্দবন্ধ গুরুত্বপূর্ণ। এর মানে ইসলামি রাষ্ট্র নয়। এর মানে কোন সমসত্ত্ব (Homogenous) মুসলিম জাতিরাষ্ট্র না। এর মাঝে আছে মুসলিম-অমুসলিম নাগরিক, সেকুলার ট্রাডিশন, আদিবাসী সম্প্রদায়, ভাষিক বহুত্ব, নারীবাদি সংগ্রাম, বামপন্থী ইতিহাস, এবং আরো সকল নৈতিক জগত। ইসলামায়িত বাংলাদেশের অর্থ এই যে ইসলামিক সভ্যতা, ভাষা, এবং নৈতিক বাংলাদেশের নৈতিক, নান্দনিক, রাজনৈতিক এবং প্রাত্যহিক জীবনকে যে গভীরভাবে গঠন করেছে আর সবের সাথে মিলেই - তা স্বীকার করে নেওয়া, এবং এই উত্তরাধিকারকে ব্যক্তিগত ধর্ম বা নিরাপত্তা সমস্যার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না করা।

ইসলামায়িত বাংলাদেশ মানে মুসলমানদের মালিকানাধীন বাংলাদেশ না, মুসলমানের বাইরে অন্যদের এক্সক্লুড করা না, দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোও না - স্রেফ এটুকুই বলা যে  সেকুলার জাতীয়তাবাদে নিরপেক্ষতার দাবি স্রেফ অভিনয় আর তা বন্ধ করা দরকার।

সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন বা প্রাধান্যকে মাথা চাড়া না দিতে দিয়েও এই সত্যটা কিভাব বলা যায় সেটাই চ্যালেঞ্জ । আর তার উত্তর হল ইনসাফ। ইনসাফ ইসলামায়িত রাজনৈতিক চিন্তাকে স্রেফ খালি এক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতির ক্লেইমের মধ্যে আবদ্ধ করা ফেলতে দেয় নয়া। এটা আর সবার সাথেই ন্যায্য সম্পর্কের দাবি করে। এটি জিজ্ঞাসা করে অন্যের প্রাপ্য কী। সিলেক্টিভ জাস্টিসকে প্রত্যাখান করে, দায়বদ্ধতাকে শুধু স্বপক্ষের ভিতর থেকে বাইরেও নিয়ে এসে বিস্তৃত করে।

অন্য কথায়, ইনসাফ ইসলামায়িত বাংলাদেশকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দর্পণে না, বরং প্লুরিভার্সাল লেন্সে দেখার সম্ভাবনা তৈরি করে।

এই পার্থক্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। একটি মেজরিটারিয়ান ইসলামায়িত পলিটির যুক্তি হল যেহেতু মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই হেতু জনজীবনে মুসলিম ক্ষমতার প্রতিফলন হওয়া উচিত। অন্য দিকে প্লুরিভার্সাল ইসলামায়িত পলিটি যখন ইনসাফ চায় তখন তার বক্তব্য এই যে বাংলাদেশ যেহেতু বহু ইতিহাস, সংঘাত, এবং জীবন প্রণালী (modes of life)র সমষ্টি - যার মধ্যে মুসলিম মাত্রাগুলোও আছে কিন্তু শুধু সেগুলোই একমাত্র নয়,  তাহলে এই পরিস্থিতিতে কি নৈতিক দায়ের জন্ম হয়? প্রথমটার দাবি মালিকানার, এর দ্বিতীয়টার দাবি ন্যায্য সম্পর্কের।

হাদী ফেনোমেনন গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ক্ষণকালের জন্য হলেও দ্বিতীয় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল, যদিও সেটি প্রথমটির দ্বারা দখল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রাখে।

১০. ইনসাফের রাষ্ট্র (?)

শেষ প্রশ্ন হলো - “ইনসাফের রাষ্ট্র” কি সম্ভব?

শব্দবন্ধটি ইচ্ছাকৃতভাবেই দ্ব্যর্থবোধক। এর অর্থ হতে পারে ইনসাফ দ্বারা শাসিত একটি রাষ্ট্র। আবার এর অর্থ হতে পারে যে সম্মিলিত জীবনের এর এমন শর্ত, যেখানে ইনসাফ জনজীবনের সকল সম্পর্কের নৈতিক আবহ (atmosphere) ওঠে। এই দ্ব্যর্থবোধক দরকারি, কারণ প্রথম অর্থে যে রাষ্ট্র উপস্থিত, সেই আধুনিক জাতিরাষ্ট্র নিজেই সমস্যার অংশ।

আধুনিক রাষ্ট্র আইন, নাগরিকতা, সার্বভৌমত্ব, প্রতিনিধিত্বশীলতা, আমলাতন্ত্র, অধিকার - এসবের মাধ্যমে জাস্টিসের প্রতিশ্রুতি দেয়। এগুলো অপ্রয়োজনীয় নয়। অরক্ষিত (vulnerable) মানুষের জন্য আইনি অধিক্রা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ হইতে পারে। রাষ্ট্র ত্যাগ করার কথা বলা সহজ, কিন্তু দরিদ্র, নির্যাতিত, বাস্তুচ্যুত, প্রান্তিক মানুষ প্রায়ই রাষ্ট্রকেই দরকার মনে করে, কারণ ইনফর্মাল (informal) নৈতিক জগতও জালেম হতে পারে।

কিন্তু একই সাথে রাষ্ট্র জাস্টিসকে সংকুচিতও করে। এটি সম্পর্ককে জুরিসডিকশান বানায়। ক্ষতকে বানায় কেইস। নৈতিক দায়বদ্ধতাকে প্রসিডিওর বানায়। তার বান্দাদের (subject) চেনে খালি প্রশাসনিক চিহ্নে। সুরক্ষাকে অসমভাবে বণ্টন করে। তার স্মৃতি সিলেক্টিভ। মানুষকে প্রতিবেশী, বিশ্বাসী, শোকার্ত, শ্রমিক, শিশু, বৃদ্ধ, শত্রু, মেহমান এর যা যা কিছুর আগে নাগরিক হইতে বলে।

ইনসাফ কি এই অনুবাদ থেকে বাঁচতে পারবে?

একটি ইনসাফের রাষ্ট্র প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেয়েও বেশি কিছু চাইবে। এটা জনজীবনের নৈতিক কল্পনাতের রূপান্তর চাইবে। আইন গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু সেটাই ন্যায্যতার শেষ মাপকাঠি থাকবে না। নাগরিকতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু তাই বিলংগিংগের শেষ কথা হবে না। প্রতিনিধিত্বও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু তাই মানুষের স্বরের হাজিরানার শেষ মোকাম হবে না। অধিকার গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু মানুষের দায়ের শেষ কেবল অধিকারের প্রশ্নে হবে না।

এমন রাষ্ট্রকে শুধু কার্যপ্রণালী, শুধু প্রসিডিওর দিয়ে বিচার করা যাবে না; তাকে তার মেজার দিয়ে বিচার করতে হবে: সে শত্রু, সংখ্যালধু, ভিন্নমতাবলম্বী, বন্দী, দরিদ্র, ধর্মীয় সাস্পেক্ট, সেকুলার সাস্পেক্ট, পরাজিত, শোকার্ত, যা কিছু অসুবিধাজনক - তার সংগে সে কেমন আচরণ করে, তাই দিয়ে বিচার করতে হবে। সিলেক্টিভ জাস্টিসকে সে কতটা অতিক্রম করে যাইতে পারে, তাই দেখতে হবে।

এরপরেও ইনসাফ রাষ্ট্রের মধ্যে পুরোপুরি ধারণ হইতে পারে না। হয়তো এটি এমন এক দাবী, যা সাক্ষাৎ রাষ্ট্রের ফর্মকেই সবসময় অতিক্রম করে যায় (post-state possibility)। যদি তাই হয়, তবে কাজটি আদতে একটা পার্ফেক্ট ইনসাফের রাষ্ট্রের নির্মাণ না; বরং সম্মিলিত জীবনেরই (collective life) এর এমন এক রূপ বিনির্মাণ করা, যা খোদ রাষ্ট্রকেই তার ধারণক্ষমতার বাইরের নৈতিকতার দাবীর সামনে দায়বদ্ধ রাখে।

এখানেই রাসূলীয় কল্পনা ফিরে আসে। ক্ষমতার আগে আমানত। কমান্ডের আগে কোভ্যানেন্ট। গ্লোরিয়াস রাপচারের বাইরে প্রাত্যহিক রূপান্তর। এগুলো প্রতিষ্ঠানের বিকল্প না। বরং এগুলো সেইসব শর্ত, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলাই কম প্রিডেটরি, কম উদ্ধত হয়ে ওঠে -  যাতে ডোমিনেশন দিয়ে সেগুলা দখল নয়া হয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রশ্ন তাই শুধু অভ্যুত্থানের পরে কে শাসন করবে নয়। গভীরতর প্রশ্ন হলো কী ধরনের রাজনৈতিক বাসনা শাসন করবে শাসকদের, আন্দোলনকে,দলকে, মসজিদকে, মন্দিরকে, ইউনিভার্সিটিকে, মিডিয়াকে, পাড়া-মহল্লাকে, এবং নাগরিককে।

এই রূপান্তর ছাড়া প্রতিটি মুক্তি আরেকবার বেহাত হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে থাকে।

১১. উপসংহার: হাদীয় ইনসাফ ও বাংলাদেশের (বা বিশ্বের) ভবিষ্যৎ

হাদী ফেনোমেননকে শোক, শাহাদত, তারুণ্যের রাজনীতি, মাদ্রাসার পরিচয়, অথোরেটিরিয়ান-বিরোধী মোবিলাইজেশন, ভারতবিরোধিতা বা নির্বাচনী ডিজরাপশনে - যদিও এগুলোর প্রতিটিই বৃহত্তর ছবির একেকটা অংশ হতে পারে। এর গভীর গুরুত্ব হলো কন্সেপচুয়াল ডিসটার্বেন্স (conceptual disturbance)।

হাদীর ফিগার একটা অবদমিত প্রশ্নকে দৃশ্যমান করে - বাংলাদেশে ইসলামায়িত নৈতিক জীবন কি রাজনৈতিক চিন্তার বৈধ, লেজিটিমেট উৎস হিসেবে হাজির হতে পারে কি না, কোন ধরনের সিকিউরাইটাইজেশন, ডোমিস্টিকেশন বা লিবারেল অনুবাদ ছাড়াই?

এই প্রবন্ধের প্রস্তাব এই যে, সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে ইনসাফ। যদি খুব চট করে তাকে জাস্টিস হিসেবে অনুবাদ করা হয়, ইনসাফ তার শক্তি হারায়। এটি অধিকার, স্বীকৃতি, ডিস্ট্রিবিউশান, প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্পত্তির পরিচিত ব্যাকরণের অন্তর্ভুক্ত আরেকটা প্রতিশব্দ হয়ে যায়। কিন্তু প্লুরিভার্সাল চিন্তায় ইনসাফ আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে: ন্যায্য সম্পর্ক, নৈতিক সমতা, সংবরণ, দায়বদ্ধতা, সিলেক্টিভ জাস্টিসের প্রত্যাখ্যানের মধ্যে দিয়ে যাপিত নৈতিক রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশন।

প্লুরিভার্স ইনসাফকে অনুবাদের বাইরে চিন্তগ্রাহ্য করে তোলে। আর ইনসাফ প্লুরিভার্সকে নৈতিক ব্যাকরণ দেয়। একসঙ্গে তারা বাংলাদেশকে ভাবতে সাহায্য করে - সেটা না একটা সেকুলার জাতিরাষ্ট্র হিসেবে যা ধর্মের সাথে দ্বন্দ্ব লিপ্ত, না একটা মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে যা ধর্মীয় অপূর্ণতায় কেঁদে মরছে। বরং এ হল চির-অসমাপ্ত সহাবস্থানের এর সঘন পরিসর, যেখানে বহু জগত ডোমিনেশন ছাড়াই সংগঠিত হতে পারে।

রাসূলীয় কল্পনা এই যুক্তিতে আরেক স্তর যোগ করে। এটি এই প্রবন্ধকে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের রোমান্টিক চিন্তার বাইরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু আরেকবার ক্ষমতা দখল নয়, আরেকটা হিরোইক বিরোধিতা না, আরেক ভ্যানগার্ড না, আরেক পরিশুদ্ধ রাষ্ট্র না। দরকার বিশ্বস্ত বান্দা, কোভ্যানেন্টাল প্রতিষ্ঠান, প্রাত্যহিক নৈতিক সংস্কার, এবং এমন রাজনৈতিক কর্তা, যারা ডোমিনেশনের লজিক পুনরোৎপাদন না করে জাস্টিসকে বহন করতে পারে।

তাই হাদীয় ইনসাফ কোনো প্রোগ্রাম না, কোনো স্মৃতিকাতরতা না, কোন সোনালী অতীতে ফিরে যাওয়ার আহবান না, কোন সাম্প্রদায়িক এসার্শান না, সেকুলার পলিটিক্সে ধর্মের ডেকোরেশন লাগানোও না। এটি একটা প্রোভোকেশন: বাংলাদেশে জাস্টিসকে হয়তো এমন নৈতিক জগতের ভেতর থেকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যেগুলোকে জাস্টিস দেওয়ার দাবিদার কাঠামোগুলোই দীর্ঘদিন অদৃশ্য, অবোধ্য,অনুচ্চারিত বানায় রাখছে।

এবং ঠিক এখানেই ইনসাফের পরিধি আরও ব্যাপক। ইনসাফকে পূর্ণ অর্থে বুঝতে হলে তাকে শুধু রাষ্ট্র, আইন, নাগরিকত্ব, বা জাতীয় ন্যায়বিচারের ভাষায় আটকে রাখা যায় না। ইনসাফকে ধারণ করতে গেলে দরকার এমন এক মেটা-প্রিন্সিপাল (meta-principle), যা ন্যায়ের মাপকে অতিক্রম করে নৈতিক সৌন্দর্য, অতিরিক্ত দায়বদ্ধতা, উদারতা, ক্ষমার সক্ষমতা, এবং অন্যের মঙ্গল চাওয়ার গভীর অভ্যাসকে অন্তর্ভুক্ত করে। ইসলামী নৈতিক ভাষায় সেই বিস্তৃত দিগন্তের নাম ইহসান (সূরা নাহল এর নব্বই নম্বর আয়াত এ দেখুন)। ইহসান ইনসাফকে বাতিল করে না; বরং তাকে পূর্ণতা দেয়। ইনসাফ যেখানে সঠিক মাপ, ন্যায্য সম্পর্ক, এবং জুলুমের প্রত্যাখ্যান দাবি করে, ইহসান সেখানে জিজ্ঞাসা করে: ন্যায়ের পরেও আমরা কীভাবে উত্তমভাবে বাঁচব? কীভাবে শুধু প্রতিকার নয়, পুনর্গঠন; শুধু জবাবদিহি নয়, আরোগ্য; শুধু অধিকার নয়, রহমত; শুধু শত্রুর পরাজয় নয়, সম্পর্কের রূপান্তর সম্ভব হবে?

সম্ভবত প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয় যে ইনসাফ আধুনিক বাংলাদেশি রাষ্ট্রের ভেতরে ধারণ করা যেতে পারে কি না। আরও কঠিন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশকে ইনসাফ দিয়েই পুনরায় কল্পনা করা যায় কি না, এবং সেই ইনসাফকে কি ইহসানের বৃহত্তর নৈতিক দিগন্তে স্থাপন করা সম্ভব কি না - এমন এক সম্মিলিত জীবন হিসেবে, যা দখল, সন্দেহ, সিলেক্টিভ শোক, এবং জাতিকে অধিকার করার অনিঃশেষ সংঘাত দ্বারা নয়; বরং সঠিক মাপ, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও উদারতা এবং অন্যদের সঙ্গে সঠিক ও উত্তমভাবে বেঁচে থাকার সুকঠিন শৃংখলা দ্বারা গঠিত।

আর এই কল্পনা বাংলাদেশেই শেষ হয় না। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ইনসাফের এক প্রয়োজনীয় কিন্তু অসম্পূর্ণ পরিসর মাত্র। যদি জুলুম, যুদ্ধ, ঋণ, জলবায়ু বিপর্যয়, সীমান্ত-হিংসা, শ্রম-শোষণ, ইসলামোফোবিয়া, এবং সাম্রাজ্যিক আধিপত্য রাষ্ট্রসীমা অতিক্রম করে কাজ করে, তবে ইনসাফও শুধু জাতীয় প্রকল্প হতে পারে না। ইনসাফের পূর্ণতা দাবি করে এক সম্মিলিত বৈশ্বিক ঐক্য - বিশেষত সেইসব মানুষ, সমাজ, এবং ভূখণ্ডের মধ্যে, যাদের জীবন বৈশ্বিক ক্ষমতার অসম বিন্যাসে ক্ষতিগ্রস্ত, অবমূল্যায়িত, অথবা অদৃশ্য করা হয়েছে। ইসলামায়িত বাংলাদেশ তাই কেবল নিজের জন্য ন্যায় চাইবে না; বরং অন্যায্য-বিশ্বের ভেতরে সম্মিলিত ইহসান ও মুক্তির ভাষা তৈরির এক অংশ হবে।

সেখানে রাজনীতির শেষ না, হয়তো আরেক রাজনীতির শুরুমাত্র। হাদী ফেনোমেননকে এই প্রবন্ধ কোনো বিশ্লেষণাত্মক অবজেক্ট হিসেবে ধরতে চায় না—যেন তাকে ব্যাখ্যা করা, শ্রেণিবদ্ধ করা, বা তার “আসল” কারণ আবিষ্কার করাই এর উদ্দেশ্য। বরং মালিক সিমোনের ভাষা ধার করলে, এটি একটি call—একটি আহ্বান, একটি নড়াচড়া, এমন কিছু যা আমাদের বিদ্যমান ধারণাগত কাঠামোকে অস্বস্তিতে ফেলে এবং অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করে। হাদী কোনো সমাপ্ত উত্তর নয়, কোনো চূড়ান্ত প্রতীকও নয়; বরং এমন এক কন্সেপচুয়াল ডিসটার্বেন্স, যা দীর্ঘদিন অনুচ্চারিত কিছু প্রশ্নকে দৃশ্যমান করে তোলে। হাদীর শাহাদাহ আরও বৃহত্তর অর্থ ধারণ করতে পারে—শুধু জাতিররাষ্ট্রের সীমাবদ্ধ কল্পনার ভেতরে কোনো জাতীয় ট্র্যাজেডি বা শহীদের স্মৃতি হিসেবে নয়; বরং বহু সহাবস্থানশীল জগতের জন্য এক বিকল্প প্রস্তাবনা হিসেবে। এটি সাক্ষী হওয়ার আহ্বান—সত্যের সাক্ষী, জুলুমের বিরুদ্ধে সাক্ষী, এবং এমন এক নৈতিক জগতের সাক্ষী, যা আধিপত্যের বাইরে সম্পর্ককে পুনর্গঠন করতে চায়। হয়তো আমাদের সামনে এমন মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে—দেখার জন্য যে আমরা আরেকটি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, আরেকটি বিজয়-পরাজয়ের ব্যাকরণ, আরেকটি জাতিরাষ্ট্রিক কল্পনা পুনরুৎপাদন করব কিনা; নাকি ইনসাফ ও ইহসানের বৃহত্তর নৈতিক দিগন্তে এমন এক সম্মিলিত বহুবৈশ্বিক জীবন কল্পনা করতে পারব, যেখানে বহু জগত পরস্পরকে মুছে না দিয়ে একসঙ্গে সঠিক, সুন্দর ও উত্তমভাবে বেঁচে থাকার নতুন শর্ত নির্মাণ করতে পারে।

__________________________

কৃতজ্ঞতা প্রকাশঃ ডঃ ফাহিম আশার ভাই, যিনি বাংলা তরজমাই শুধু করেননি, বরং, আইডিয়া গুলোকে গুছিয়ে দিয়েছেন অনেকাংশে।