শহীদের সাক্ষ্য: ওসমান হাদি এবং বাংলাদেশে মুসলিম তৎপরতার অমীমাংসিত প্রশ্ন
সিদ্দিকে আকবর
২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখো মানুষ। শীতের দিন, কিন্তু ভিড়ের উত্তাপে বাতাস ভারী হয়ে আছে। কেউ কাঁদছে, কোথাও সমস্বরে 'আল্লাহু আকবার' রব উঠছে। সমাবেশের একেবারে সামনে একটা কফিন - যার ভেতরে মাত্র বত্রিশ বছরের এক যুবক। তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ডক্টর ইউনূসও জানাজার আগে মঞ্চে উঠেছিলেন। কিন্তু তিনি বিচারের কোনো আশ্বাস দিলেন না। শুধু দোয়া করতে বললেন। তাঁকে বরং অসহায়ই মনে হলো - যেনবা এক অদৃশ্য শক্তির সামনে তিনিও অপারগ।
সেই ঐতিহাসিক জানাজায় আমারও থাকার সুযোগ হয়েছিল। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে হাদি ভাই। একটা সাধারণ মুসলিম ঘরের সন্তান - কিন্তু কী অসাধারণ যে এভাবে রাজকীয় বিদায় পেতে পারে।
কিন্তু এই শোকের ভিড়ে একটা প্রশ্ন অনুপস্থিত ছিল - হাদির শাহাদাত আসলে কী উন্মোচন করেছে? ইরানি চিন্তাবিদ আলী শরিয়তি বলেছিলেন, শাহাদাত হলো ঢেকে রাখা সত্যকে প্রকাশ করা। লাখো মানুষের জানাজা সেই সত্যের একটা সাক্ষ্য। কিন্তু সেই সাক্ষ্যকে শুধু শোকে মুড়ে রাখলে সত্য আবার ঢেকে যায়। হাদির শাহাদাত কোন সত্যটা উন্মোচন করেছে - সেই প্রশ্নটা তোলাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখানো।
একদিনের স্মৃতি
হাদি ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ২০২৩ সালের দিকে, ফাহমিদুর রহমান স্যারের চেম্বারে। আমরা কয়েকজন বন্ধু ও বড়ভাই মিলে গিয়েছিলাম তাঁর সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে। কিছুক্ষণ পরে দেখি হাদি ভাইয়েরাও কয়েকজন মিলে হাজির। সেখানেই তাঁকে প্রথম দেখা।
একটু সময় যেতে না যেতেই পুরো পরিবেশ তর্কে-বিতর্কে মেতে উঠল। সেদিন আলাপ হচ্ছিল নজরুলকে নিয়ে। প্রশ্নটা ছিল - রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে নজরুল কি বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে কোনো বিকল্প হতে পারেন? আমাদের গ্রুপের একজন বড়ভাই ছিলেন এই প্রস্তাবের বিপক্ষে। হাদি ভাই ছিলেন পক্ষে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত হাদি ভাই হার মেনেছিলেন।
হার মানাটাই স্বাভাবিক। কারণ এটা সত্য যে নজরুল আসলে মোক্ষম বিকল্প হতে পারেন না। তাঁর চিন্তাধারার মূল কাঠামো ছিল উদার-মানবতাবাদী। নজরুল রবীন্দ্রনাথকে গুরু হিসেবে সমীহ করতেন। তিনি মুসলিম সংস্কৃতির গান-গজল লিখেছেন, কিন্তু ইসলামি সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মুসলমানের রাজনৈতিক ও সত্তাগত নির্মাণের কাজ করেননি। এবনে গোলাম সামাদ তাঁর লেখায় বারবার দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয় রবীন্দ্রনাথীয় ধারার বাঙালিত্ব থেকে আলাদা - এটা একটা স্বতন্ত্র সভ্যতামূলক পরিচয়, যেটাকে স্বীকার না করলে বাঙালি মুসলমান তার নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে বুঝতে পারবে না।
সে বিতর্ক এই লেখার মূল বিষয় নয়। কিন্তু এই বিতর্কের বিষয়বস্তুর চেয়েও বেশি যে বিষয়টা আমার ভালো লেগেছিল তা হলো হাদি ভাইয়ের বিনয়। তিনি বিতর্কে হারলেন এবং মেনে নিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, তিনিও আসলে বাঙালি মুসলমানের মুক্তির পথ খুঁজছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তিনি বক্তৃতায় খুঁজেছেন, কবিতায় খুঁজেছেন, রাজপথে খুঁজেছেন। এবং এই খোঁজাটাকে কেবল সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান বলা ভুল হবে - এটা ছিল গভীরভাবে রাজনৈতিক।
মুসলমানিত্বের ভেতর দিয়ে রাজনীতি
ওসমান হাদির রাজনৈতিক তৎপরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর সমস্ত সক্রিয়তা প্রকাশিত হয়েছে মুসলমানিত্বের ভেতর দিয়ে। এটা কোনো কৌশলগত পরিচয় নয়, কিংবা নির্বাচনী হিসাব নয়। এটা তাঁর সত্তার একটা মৌলিক শর্ত।
এখানে একটা পার্থক্য বোঝা দরকার। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুসলিম পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বহুবার - কখনো ভোটের হিসাবে, কখনো জোটের কৌশলে। কিন্তু এই ব্যবহার সবসময়ই ছিল যান্ত্রিক - ইসলামকে একটা হাতিয়ার হিসেবে নেওয়া, কিন্তু ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ না করা। হাদির ক্ষেত্রে পার্থক্যটা ছিল এখানেই - তাঁর কাছে ইসলাম ছিল একটা দৃষ্টিভঙ্গি, একটা বিশ্লেষণের হাতিয়ার, একটা নৈতিক কাঠামো - যার ভেতর দিয়ে তিনি রাষ্ট্র, ক্ষমতা এবং সংস্কৃতিকে পাঠ করতে চাইতেন।
হাদি ছিলেন একজন গণবিদ্ধিজীবী। প্রতিটি সামাজিক শ্রেণি তার নিজস্ব বুদ্ধিজীবী তৈরি করে - যারা সেই শ্রেণির অভিজ্ঞতাকে সচেতনতায় রূপান্তরিত করে এবং তার স্বার্থকে ভাষা দেয়। হাদি ছিলেন সেই অর্থে বাংলাদেশের মুসলিম তরুণের অরগানিক ইন্টেলেকচুয়াল - নলছিটির মাদ্রাসা থেকে উঠে আসা, শিক্ষকতা করা, রাজপথে নামা একজন মানুষ, যিনি তাঁর সমাজের যন্ত্রণাকে কেবল ভাষা দেননি, সেই যন্ত্রণার একটা কাঠামোগত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর প্রক্রিয়ায় রত ছিলেন।
কিন্তু গ্রামসির আরেকটি ধারণা এখানে আরো সরাসরি প্রযোজ্য - হেজেমনি এবং কাউন্টার-হেজেমনি। গ্রামসি দেখিয়েছিলেন, আধিপত্যশালী শক্তি কেবল বলপ্রয়োগে নয়, সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে তার আধিপত্য টেকসই করে। যখন আধিপত্যশালী শক্তি তার নিজের মূল্যবোধ, ইতিহাসব্যাখ্যা এবং সাংস্কৃতিক বয়ানকে 'স্বাভাবিক' ও 'সার্বজনীন' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে - তখনই হেজেমনি বা ভাবাধিপত্য সম্পূর্ণ হয়। বাংলাদেশে এই সম্মতি উৎপাদনের যন্ত্রগুলো সুনির্দিষ্ট। জাতীয় পাঠ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথীয় বাঙালিত্বের কেন্দ্রীয় অবস্থান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্মাণ, মূলধারার মিডিয়ায় মুসলিম রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা - এগুলো পৃথক ঘটনা নয়, এগুলো একটা হেজেমনিক প্রকল্পের অংশ। এই প্রকল্পের মূল কাজ হলো মুসলিম পরিচয়কে 'সাম্প্রদায়িক', 'পাকিস্তানপন্থী', 'মৌলবাদী' হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে রাজনৈতিকভাবে অবৈধ করে রাখা।
হাদি এই বয়ানের বিপরীতে একটা কাউন্টার-হেজেমনিক অবস্থান নিচ্ছিলেন - কেবল বিরোধিতার অর্থে নয়, বরং একটা পাল্টা ব্যাখ্যাকাঠামো নির্মাণের অর্থে। তিনি দেখাতে চাইছিলেন যে বাংলাদেশের মুসলিম মানুষের একটা স্বতন্ত্র সভ্যতামূলক পরিচয় আছে - এবং সেই পরিচয়ের রাজনৈতিক প্রকাশ কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং একটা ঐতিহাসিক সিলসিলা। ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং দেশীয় সেক্যুলার এলিটের ইসলামবিরোধী যুক্তি যে একই হেজেমনিক কাঠামোর দুটো মুখ - এই সংযোগটা তিনি স্পষ্ট করে যাচ্ছি ক্রমাগত।
মিশেল ফুকো যাকে বলেছেন সাবজুগেটেড নলেজ - অর্থাৎ যে জ্ঞানধারাকে আধুনিক রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতিগতভাবে প্রান্তিক করে রাখে - হাদির বাগ্মিতা ছিল সেই দমিত জ্ঞানভাণ্ডারের একটা পুনরুত্থান। নলছিটির মাদ্রাসাশিক্ষিত একটা ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ পার হয়ে যখন রাজপথে দাঁড়িয়ে ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তখন তাঁর কণ্ঠস্বরে কেবল একজন ব্যক্তির আওয়াজ নেই - আছে একটা দীর্ঘ নীরব করে রাখা ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। 'সীমান্ত শরীফ' ছদ্মনামে লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'লাভায় লাল শাক পুবের আকাশ' - এই নামের ভেতরে সেই সংশ্লেষণের আকাঙ্ক্ষা আছে। লাভা ধ্বংস করে, আর পুবের আকাশ মানে উদয়, নতুন সূচনা। এটা কোনো বিষণ্ন সীমান্তবাসীর ভাষা নয় - এটা একজন নির্মাতার ভাষা।
হাদীর তৎপরতার অনেক ছোটখাট অসঙ্গতি দেখিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে চায় যে, হাদি আদৌ ততটুকু কিনা, যতটুকু তার ব্যাপারে বলা হয়। যত যাই বলা হোক, কোনোটাই হাদির তৎপরতার মূল থিসিসকে বাতিল করে না।
যে সত্য ছিল ঢেকে রাখা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটা দীর্ঘ নীরবতা আছে। ১৯৭১-পরবর্তী রাষ্ট্রনির্মাণে যে সেক্যুলার-বাঙালি জাতীয়তাবাদী বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটা একটা বিশেষ যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে - যার মাধ্যমে ইসলামি পরিচয়কে বারবার 'মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী', 'পাকিস্তানপন্থী', 'মৌলবাদী' - এই লেবেলগুলোর মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। এই বয়ান কোনো নিরীহ ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নয় - এটা একটা সক্রিয় রাজনৈতিক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে শাসকশ্রেণি তার বিরুদ্ধে যেকোনো মুসলিম প্রতিরোধকে অবৈধ ঘোষণা করে।
এই বয়ানের ঐতিহাসিক উৎস বোঝা দরকার। এটা বলা বাহুল্য যে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটা প্রেরণা ছিল। সে বছর এপ্রিল মাসে স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র হয় সেটি তৈরি করেছিলেন ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, যিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান ব্যারিস্টার সুব্রত রায় চৌধুরীর একান্ত অনুগত। সুব্রত রায়ের পরামর্শেই এর ড্রাফট তৈরি করেন আমিরুল ইসলাম। তিনি পাকিস্তানের সংবিধানের ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটান সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানের সংবিধানে ছিল ইসলামী আদর্শ, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্র এসব নীতি। কিন্তু এপ্রিল ঘোষণায় সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো কিছু ইউরোপীয় ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতালব্ধ ও ইউরোপীয় জ্ঞানকাণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু নীতি নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে সংবিধানের সাথে জনপদের মানুষের মূল্যবোধ, জীবনবোধ ও অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এমনকি যুদ্ধের সারেন্ডারের স্বাক্ষরও হয় ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের জেনারেল নয়, বরং ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের জেনারেলের মধ্যে। এত বেশি পরিমাণ ইন্ডিয়ান ইন্টারভেনশন দেখলে বিষয়গুলোর গতিপ্রকৃতি বুঝার আর বাকি থাকে না।
১৯৭২-এর সংবিধান রচিত হয় সেই এপ্রিল ঘোষণাকে সামনে রেখেই। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা দেশে ইসলামি রাজনৈতিক পরিচয়কে সংবিধানিকভাবে প্রান্তিক করে রাখা। পরবর্তী দশকগুলোতে এই প্রকল্প বিভিন্ন রূপ নিয়েছে - কখনো সাংস্কৃতিক নীতির মাধ্যমে, কখনো শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের মাধ্যমে, কখনো মিডিয়ার বয়ান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা এই প্রকল্পের সবচেয়ে নগ্ন প্রকাশের কিছু ঘটনা। সেই রাতে যারা মারা গিয়েছিল, তাদের মৃত্যু দীর্ঘদিন সরকারিভাবে অস্বীকার করা হয়েছিল। এই অস্বীকৃতি কোনো তথ্যগত ভুল ছিল না - এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা এখন অনেকটাই উন্মোচিত।
আশিলি এমবেম্বে তাঁর 'Necropolitics' প্রবন্ধে ফুকোর biopolitics ধারণাকে আরো গভীরে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল প্রশ্ন হলো - কে বাঁচবে এবং কাকে মরতে দেওয়া হবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে একটা এপিস্টেমিক বা জ্ঞানগত কাঠামো - যা নির্ধারণ করে কার মৃত্যু শোকযোগ্য, কার মৃত্যু রাজনৈতিক হত্যা বলে স্বীকৃত হবে, আর কার মৃত্যু কেবল 'আইনশৃঙ্খলার সমস্যা' হিসেবে চিহ্নিত হবে। জুডিথ বাটলার এই প্রশ্নকে আরো সামনে এনেছেন তাঁর 'precarious life' ধারণায় - কিছু জীবন এমন আছে যেগুলোর ক্ষতি বা বিনাশ সমাজের কাছে শোকের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয় না, কারণ সেই জীবনগুলোকে প্রথমেই 'জীবন' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের সেক্যুলার-বাঙালি জাতীয়তাবাদী কাঠামো মুসলিম রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে বারবার এই ‘শোকের অযোগ্য’ অবস্থানে রেখেছে। শাপলা চত্বর থেকে হাদির হত্যাকাণ্ড - এই ধারাবাহিকতাটা কোনো কাকতাল নয়, এটা একটা কাঠামোগত যুক্তির ফল। হাদির হত্যাকাণ্ডের পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি যে চার্জশিট দিয়েছে, সেটা এই কাঠামোর একটা নির্মম উদাহরণ। চার্জশিটে বলা হয়েছে - একজন ওয়ার্ড কমিশনারের 'রাজনৈতিক প্রতিহিংসা' থেকে এই হত্যা। যেখানে সন্দেহভাজন খুনিরা হত্যার পরপরই হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে গেছে এবং সীমান্তে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছে ভারতীয় নাগরিকরা - সেই হত্যাকে স্থানীয় প্রতিহিংসার ঘটনায় নামিয়ে আনা কোনো তদন্তের ব্যর্থতা নয়, এটা necropolitics-এর একটা সচেতন প্রয়োগ। রাষ্ট্র ঠিক করে দিচ্ছে হাদির মৃত্যু কোন শ্রেণির মৃত্যু - এবং সেই শ্রেণিনির্ধারণের মাধ্যমে সত্যিকারের তদন্তের পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ইতোমধ্যে তেরোবার পিছিয়েছে। তেরোবার! এই সংখ্যাটি কোনো প্রশাসনিক অদক্ষতার চিহ্ন নয়, এটি একটা রাজনৈতিক বার্তা।
তালাল আসাদ তাঁর 'Formations of the Secular' গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সেক্যুলারিজম কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নয় - এটা নিজেই একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রকল্প, যা ধর্মকে 'ব্যক্তিগত' পরিসরে আটকে রেখে রাজনৈতিক পরিসর থেকে বিতাড়িত করতে চায়। বাংলাদেশে এই প্রকল্প আরো বিশেষভাবে জটিল - কারণ এখানে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' একটা নির্দিষ্ট আঞ্চলিক আধিপত্যের সাথে গেঁথে গেছে। ভারতীয় রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের 'ধর্মনিরপেক্ষ' ধারার রাজনীতি ছিল একটা কৌশলগত সম্পদ - কারণ এই ধারা মুসলিম রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত রাখে এবং দেশটিকে আঞ্চলিক আধিপত্যের কাছে বেশি ভঙ্গুর করে। হাদি এই সংযোগটাকে সরাসরি নাম দিয়েছিলেন, স্পষ্ট করেছিলেন। এবং এই নামকরণই তাঁকে দুই দিক থেকে শত্রু বানিয়েছিল।
শরিয়তি বলেছিলেন, শাহাদাত কোনো পরাজয় নয় - এটা হলো ঢেকে রাখা সত্যকে প্রকাশ করার সর্বোচ্চ উপায়। হাদি যে সত্যটা বারবার বলছিলেন - এই রাষ্ট্র মুসলিম জীবনকে মূল্য দেয় না, এই সংস্কৃতি মুসলিম পরিচয়কে অবৈধ করে রাখে, এই আধিপত্য দেশীয় ও আঞ্চলিক শক্তির যোগসাজশে টিকে আছে - তাঁর হত্যাকাণ্ড সেই সত্যের সবচেয়ে নির্মম প্রমাণ হয়ে গেছে।
শোকের ফাঁদ
হাদির শাহাদাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে লেখা হলো: 'ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আল্লাহ মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।' এই বাক্যটার ভেতরে ধর্মীয় ভাষা ও রাজনৈতিক চিহ্নিতকরণ একসাথে এসেছে - ঠিক আছে। কিন্তু এর পরে কী হলো সেটা লক্ষ করার বিষয়।
তাঁর মৃত্যুর পরে মানুষ তাঁর বক্তৃতার ক্লিপ শেয়ার করেছে, তাঁর ছবি শেয়ার করেছে, তাঁর নামে স্লোগান দিয়েছে। এই সবকিছু স্বাভাবিক এবং মানবিক। কিন্তু এই আবেগের ঢেউয়ের নিচে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
শোক একটা সাংস্কৃতিক রিচুয়াল, যেটা মানুষকে শেখায় কীভাবে শোক করতে হয় - জানাজা, স্লোগান, স্মরণসভা। পল কনারটন তাঁর 'How Societies Remember' গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সমাজের স্মৃতি কেবল তথ্যের সংরক্ষণ নয় - এটা একটা পারফরমেটিভ প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট আচার ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অতীতকে বর্তমানে উপস্থিত করা হয়। কিন্তু এই পারফরমেটিভ স্মৃতির একটা বিপদ আছে - এটা যা মনে রাখে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এটা কী ভুলিয়ে দেয়। শহীদ একবার আইকনে পরিণত হলে তাঁর চিহ্নিত করা সত্য বিশ্লেষণ করার বদলে শুধু তাঁকে স্মরণ করা হয়। নিছক শোক ক্রোধকে নিষ্ক্রিয় করে, সত্যকে আবার ঢেকে দেয়।
এখানেই একটা সতর্কতার দরকার। ওসমান হাদির কাজকে শুধু সাংস্কৃতিকতায় পর্যবসিত করার একটা প্রবণতা আছে - তাঁকে কবি বানানো, অসম্পূর্ণ স্বপ্নের বাহক বানানো। এই পাঠ একটা অর্থে সত্য, কিন্তু অন্য একটা অর্থে বিপজ্জনক। কারণ এটা তাঁর তৎপরতার রাজনৈতিক ধার কমিয়ে দেয়। যে সাংস্কৃতিক পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে বাকশালী আধিপত্য টিকে ছিল - রবীন্দ্রনাথীয় সেক্যুলার বাঙালিত্ব, ভারতপন্থী সাংস্কৃতিক এলিটের একচেটিয়া আধিপত্য, মুসলিম পরিচয়কে 'সাম্প্রদায়িক' বলে চিহ্নিত করার রাজনীতি - হাদি এই পাটাতনকে চিহ্নিত করেছিলেন এবং সেটার বিরুদ্ধে একটা কাউন্টার অবস্থান নিয়েছিলেন। এটা কোনো নিছক সাংস্কৃতিক বিতর্ক ছিল না - এটা ছিল একটা গভীর রাজনৈতিক সংঘাতের স্বীকৃতি।
ওয়ান ম্যান আর্মি এবং কাঠামোগত অসম্ভাব্যতা
ইনকিলাব মঞ্চ তৈরি হয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থানের পরে, হাদি ভাইয়ের হাত ধরেই। মঞ্চটি দ্রুত পরিচিতি পেয়েছিল, সমাবেশ করেছিল, সংবাদমাধ্যমে জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু মঞ্চটি মূলত একটা মানুষের উপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর মঞ্চ আর আগের মহিমায় নেই।
ওয়েবারের ভাষায় যদি বলি, 'routinization of charisma' - ক্যারিশমাটিক কর্তৃত্ব যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না নেয়, তবে সেটা ব্যক্তির সাথেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই ব্যর্থতাকে কেবল হাদির সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে পাঠ করলে একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য হাতছাড়া হয়ে যাবে। routinization কেন সম্ভব হলো না - এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে কাঠামোতে, ব্যক্তিচরিত্রে নয়।
ওয়েল হাল্লাক তাঁর 'The Impossible State' গ্রন্থে একটা মৌলিক থিসিস উপস্থাপন করেছেন। তাঁর আর্গুমেন্ট হলো, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল একটা শাসনব্যবস্থা নয় - এটি একটা সম্পূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক প্রকল্প। আধুনিক রাষ্ট্র নিজেকে মোরাল এজেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এই দাবির মাধ্যমে ধর্মীয় নৈতিক কর্তৃত্বকে সরিয়ে দেয়। রাষ্ট্র নির্ধারণ করে কোন ধরনের রাজনৈতিক সত্তা 'বৈধ' - এবং ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তা এই কাঠামোতে কাঠামোগতভাবেই 'সন্দেহজনক' অবস্থানে থাকে। বাংলাদেশে এই কাঠামোগত বাধা আরো নির্দিষ্ট রূপ নিয়েছে। যেকোনো মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেই তাকে 'জঙ্গিবাদ', 'মৌলবাদ' বা 'পাকিস্তানপন্থী' লেবেল দিয়ে অবৈধ করে ফেলার একটা প্রস্তুত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আছে।
গ্রামসির ভাষায় বলতে গেলে, বাংলাদেশে মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান-নির্মাণ শুরু থেকেই একটা 'war of position' লড়তে বাধ্য হয় - অর্থাৎ, কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের বৈধতার জন্যই লড়াই করতে হয়। এই অবস্থানে থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ অত্যন্ত কঠিন। ফলে হাদির ওয়ান ম্যান আর্মি হওয়াটা কেবল তাঁর ব্যক্তিত্বের ফল নয় - এটা সেই কাঠামোগত বাস্তবতারও প্রতিফলন, যেখানে প্রতিটি প্রজন্মকে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়, কারণ আগের প্রজন্মের নির্মিত প্রতিষ্ঠান টিকতে দেওয়া হয় না। এটাকে বলা যায় সাংস্কৃতিক স্মৃতির কাঠামোগত বিনাশ - আমরা শহীদদের মনে রাখি, কিন্তু তাঁদের প্রকল্প মনে রাখি না।
নান্দনিকতা থেকে রাজনীতি
শহীদের স্মৃতি যখন শুধু আবেগের উপকরণ হয়ে ওঠে, তখন সেই স্মৃতি একটা নান্দনিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয় - যেটা মর্মস্পর্শী, কিন্তু নিষ্ক্রিয়। মানুষ কাঁদে, অনুপ্রাণিত হয়, কিন্তু কাঠামো বদলায় না। শোকের এই নান্দনিক রূপান্তর আসলে প্রতিরোধকে নিরস্ত্র করে।
হাদির স্পিরিটকে নান্দনিকতায় পর্যবসিত না করে তাকে রাজনৈতিক তৎপরতায় রূপান্তরিত করতে হলে তিনটি কাজ একসাথে করতে হবে।
প্রথমত, সংঘাতের স্বরূপ বোঝা। হাদি যে সংঘাতটা চিহ্নিত করেছিলেন - অর্থাৎ ভারতীয় আধিপত্যবাদ, দেশীয় এলিটের সেক্যুলার হেজেমনি এবং মুসলিম রাজনৈতিক সত্তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সংযোগ - এই সংঘাতকে কেবল জাতীয়তাবাদী আবেগে নয়, বরং তাত্ত্বিক কাঠামোয় বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কারণ কাঠামো না বুঝলে কৌশল নির্ধারণ করা যায় না।
দ্বিতীয়, শত্রু-মিত্রের ভেদজ্ঞান। আধিপত্যবিরোধী লড়াই কেবল মুখের বদল নয়, কাঠামোর পরিবর্তন দাবি করে। মিত্র নির্বাচনে এই বিচক্ষণতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে কঠিন - লড়াইকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। এটা সত্য যে, এটা করা দুঃসাধ্য তো বটেই, রীতিমত অসম্ভবের কাছাকাছি করে রাখা হয়েছে, সেই অসম্ভাব্যতার ভেতরেও পথ খুঁজতে হবে। জ্ঞান উৎপাদনের স্বাধীন কেন্দ্র নির্মাণ, সাংস্কৃতিক স্মৃতির সংরক্ষণ, এবং রাজনৈতিক চিন্তাকে একটা সম্মিলিত প্রকল্পে রূপান্তরিত করা - এই কাজগুলো কোনো একক ব্যক্তির উপর নির্ভর করতে পারে না। তাই তৎপরতার প্রতিষ্ঠানিকীকরণ একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
শাহাদাতের দাবি
ওসমান হাদিকে ভালোবাসা এবং তাঁর অসম্পূর্ণ কাজকে এগিয়ে নেওয়া - এই দুটো একসাথে না করলে ভালোবাসাটা আবেগসর্বস্ব হয়ে যায়।
হাদি যা করেছিলেন তার মূল্য এই নয় যে তিনি কোনো চূড়ান্ত সমাধান দিয়ে গেছেন। বরং তাঁর মূল্য এই যে তিনি একটা সংঘাতকে নাম দিয়েছিলেন যেটা দীর্ঘদিন ঝাপসা ছিল - বাংলাদেশের মুসলিম মানুষের রাজনৈতিক সত্তার বিরুদ্ধে একটা কাঠামোগত, ঐতিহাসিক এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের সংঘাত। এই নামকরণ ও স্পষ্টিকরণ নিজেই একটা রাজনৈতিক কাজ, কারণ ফুকো আমাদের শিখিয়েছেন - যা নামহীন তা প্রতিরোধহীন।
সেদিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লক্ষ মানুষ এসেছিল শুধু একটা কফিনের সামনে দাঁড়াতে নয় - কফিনের ভেতরে শুধু একটা মানুষ ছিলেন না, ছিল একটা উন্মোচিত সত্য, যেটাকে আবার ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। চার্জশিটের ভাষায়, তদন্ত পেছানোর তারিখে, রাষ্ট্রীয় নীরবতায় - সেই চেষ্টা দৃশ্যমান।
শরিয়তির ভাষায় শাহাদাত তখনই অর্থবহ হয় যখন সে ঢেকে রাখা সত্যকে কেবল উন্মোচন করে না, বরং সেই সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব জীবিতদের উপর অর্পণ করে। সেই সত্যকে জীবিত রাখা - চিন্তায়, প্রতিষ্ঠানে, প্রজন্মের কাছে - এটাই শাহাদাতের দাবি। শোকের নান্দনিকতায় নয়, রাজনৈতিক তৎপরতায়। শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর অনুজরা সে পথে হাঁটলেই তাঁর শাহাদাত পূর্ণতা পাবে।
