শরিফ ওসমান হাদি : নীরবতার কণ্ঠস্বর
আহমাদ সাব্বির
ওসমান হাদির আবির্ভাব এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটে গভীরভাবে নিমজ্জিত। ফ্যাসিবাদ কেবল রাষ্ট্রক্ষমতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ভাষা, ইতিহাস, শিক্ষা, মিডিয়া ও সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকে এক নীরব দাসত্ব কায়েম করেছিল। এই দমবন্ধ করা সময়ে ওসমান হাদি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের কণ্ঠ, ইনসাফের ডাক, এবং স্বাধীনতা-পুনরুদ্ধারকারী স্বপ্নের প্রতীক
২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর—এই দিনটি যেন ইতিহাস নিজ হাতে লিখে নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের পক্ষে ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক ব্যতিক্রমী সেমিনার এবং পরবর্তীতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইনকিলাব মঞ্চ—এই দুই মঞ্চেই ওসমান হাদির দৃপ্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে দেয়, তিনি কেবল একজন সংগঠক নন; তিনি এক দর্শনের ধারক। এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর ব্যক্তিত্বের সাতটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, যা তাকে সমসাময়িক রাজনৈতিক চরিত্রগুলোর ভিড় থেকে আলাদা করে দেয়।
প্রথমত, তার অসাধারণ বাগ্মিতা। হাদির বক্তৃতা ছিল বজ্রনিনাদের মতো—শ্রোতাকে শুধু আবেগতাড়িত করত না, বরং চিন্তার কাঠামো ভেঙে নতুন বোধের জন্ম দিত। তিনি কথা বলতেন যুক্তি, ইতিহাস ও নৈতিক দৃঢ়তা নিয়ে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংকট সম্পর্কে তার গভীর ও পরিপক্ব বোঝাপড়া। রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামো, বৈষম্য, জনমানুষের ক্ষোভ—এসব বিষয়ে তার বিশ্লেষণ ছিল তীক্ষ্ণ ও বাস্তবমুখী।
তৃতীয়ত, কালচারাল ফ্যাসিবাদ নিয়ে তার গভীর উদ্বেগ। তিনি বুঝতেন, বন্দুকের ফ্যাসিবাদ যতটা ভয়ংকর, চিন্তা ও সংস্কৃতির ফ্যাসিবাদ তার চেয়েও মারাত্মক। চতুর্থত, তার দেশপ্রেম ছিল নিছক স্লোগান নয়—বরং আত্মার শ্বাস-প্রশ্বাস। বাংলাদেশ, তার সার্বভৌমত্ব ও মানুষের মর্যাদা ছিল তার অস্তিত্বের কেন্দ্র।
পঞ্চমত, ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রশ্নে তার আপসহীন অবস্থান। ক্ষমতা নয়, ন্যায়—এই ছিল তার রাজনীতির মূলমন্ত্র। ষষ্ঠত, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নির্ভীক সংগ্রাম। তিনি জানতেন, এই লড়াই নিঃসঙ্গতার; তবু পিছপা হননি। সপ্তমত, সব ধরনের আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বিদেশি দাসত্বের বিরুদ্ধে তার সুস্পষ্ট অবস্থান—যা তাকে এক অনন্য জাতীয় চরিত্রে পরিণত করে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বয়েই ওসমান হাদি হয়ে উঠেছিলেন প্রত্যাশার প্রতীক—যে প্রত্যাশা জাতির গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়। তিনি কেবল কথা বলেননি, তার কথার দায় তিনি নিজের জীবন দিয়ে শোধ করেছেন। ‘জান দেব, কিন্তু জুলাই দেব না’—এই উচ্চারণ ছিল তার অঙ্গীকার, যা তিনি বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
জীবন, মৃত্যু ও শাহাদাত—এই তিনটি বিষয়েই হাদির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বচ্ছ ও দৃঢ়। শহিদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার কাছে কোনো রোমান্টিক কল্পনা ছিল না; ছিল ইনসাফের পথে সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রস্তুতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, দীর্ঘ জীবন নয়—ইমপ্যাক্টই আসল। তাই বলতেন, ‘পাঁচ বছর বেঁচে যদি ইতিহাস বদলানো যায়, সেটাই যথেষ্ট।’
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাকে এমপি বানায়নি, কিন্তু বানিয়েছে কোটি মানুষের হৃদয়ের বাদশাহ। আল্লাহ তাকে দান করেছেন শাহাদাতের মর্যাদা—যা দুনিয়ার সব ক্ষমতার ঊর্ধ্বে। তার শাহাদাতের পর গোটা দেশ, এমনকি বিশ্বব্যাপী মানুষের আবেগ, দোয়া ও শ্রদ্ধা প্রমাণ করে—তিনি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক কালেক্টিব কনশাস।
হাদি এমন এক সময়ে কথা বলেছিলেন, যখন ভাষা শাসিত হচ্ছিল, ভিন্নমতকে ক্রমশ বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছিল এবং সংস্কৃতি তার বহুত্ববাদী চরিত্র হারিয়ে নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রে পরিণত হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ওসমান হাদির প্রধান অবদান ছিল ক্ষমতার দৃশ্যমান দমন নয়, বরং অদৃশ্য কিন্তু গভীরতর বিপদ—সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ—কে চিহ্নিত করা।
ফ্যাসিবাদকে সাধারণত সহিংসতা, সেনাশাসন বা সংবিধান স্থগিতের মাধ্যমে বোঝা হয়। কিন্তু হাদির বিশ্লেষণ দেখায়, ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে সম্মতির নির্মাণের মাধ্যমে—সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্মৃতি ও অর্থের নিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে। এই জায়গাতেই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব ঘটে। এটি এমন এক কর্তৃত্ববাদ, যা ঠিক করে দেয় কোন ইতিহাস গ্রহণযোগ্য, কোন পরিচয় বৈধ, কোন অনুভূতি দেশপ্রেমিক আর কোনটি দেশদ্রোহী। ফলে সংস্কৃতি আর যৌথ উত্তরাধিকার থাকে না; তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার অস্ত্র।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদ উচ্চকণ্ঠে আসেনি; এসেছে ধীরে ধীরে—জাতীয়তাবাদ, ইতিহাস রক্ষা বা স্থিতিশীলতার নামে। মুক্তিযুদ্ধের মতো যৌথ নৈতিক ভিত্তিও ক্রমে ক্ষমতার প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে সমালোচনামূলক প্রশ্ন, বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা সৎ অনুসন্ধান সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। সরাসরি দমন না করেও সামাজিক অপবাদ, নৈতিক প্রশ্নবিদ্ধতা কিংবা ‘অকৃতজ্ঞতা’র অভিযোগের মাধ্যমে ভিন্নমতকে কোণঠাসা করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়াকে হাদি অস্বস্তিকর স্পষ্টতায় ভেঙে দিয়েছিলেন। তার বক্তব্য ছিল দ্ব্যর্থহীন—জাতীয়তাবাদ কখনো আত্মসমর্পণের নাম হতে পারে না, এবং ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা বর্তমানের অবিচারকে আড়াল করার অজুহাত হতে পারে না। তার মতে, সংস্কৃতির কাজ নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা নয়; বরং নাগরিকত্বকে আরো মানবিক করা।
হাদির চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভারতীয় আধিপত্য ও নীরবতার রাজনীতি। তিনি দেখিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদকে ভারতীয় প্রভাবের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বোঝা অসম্ভব। এই আধিপত্য সরাসরি বলপ্রয়োগে নয়, বরং বর্ণনাশৈলী ও সাংস্কৃতিক সম্মতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। ‘স্থিতিশীলতা’ এমনভাবে সংজ্ঞায়িত হয়, যেখানে ভারতীয় কৌশলগত স্বার্থ সর্বাগ্রে স্থান পায়, আর সীমান্ত হত্যা, জলসম্পদ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রান্তিক হয়ে পড়ে। হাদির যুক্তি ছিল গভীর কিন্তু সরল—বন্ধুত্ব নীরবতার শর্ত হতে পারে না; আর যেখানে সাংস্কৃতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, সেখানে সার্বভৌমত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে।
ওসমান হাদিকে কেবল একজন ভুক্তভোগী হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন তত্ত্ব ও রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়ানো এক বিরল কণ্ঠ। রাস্তাঘাটের ভাষায় কথা বললেও তার চিন্তা প্রোথিত ছিল গভীর সমালোচনামূলক ঐতিহ্যে। তিনি বুঝেছিলেন, কর্তৃত্ববাদ শুধু দেহ নয়, কল্পনাকেও উপনিবেশে পরিণত করে। তাই তার মৃত্যু ছিল শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি সেই মূল্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা স্পষ্টতার অনুসন্ধানীরা প্রায়শই দিয়ে থাকেন।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান বাস্তবতায় হাদির সতর্কবাণী আরো প্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্র বাহ্যিক কাঠামো বজায় রাখলেও ভিন্নমতের নৈতিক পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। দমন এখন প্রকাশ্য নয়; বরং নিরাপত্তাকে নজরদারির সঙ্গে, নীরবতাকে স্থিতিশীলতার সঙ্গে এবং আনুগত্যকে দেশপ্রেমের সঙ্গে একাকার করা হচ্ছে। বিদেশি হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব, নির্বাচনী রাজনীতিকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে হাদি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, গণতন্ত্র কেবল ভোট বা আইন দিয়ে মাপা যায় না। গণতন্ত্র বেঁচে থাকে শ্রেণিকক্ষে, মুক্ত বিতর্কে, প্রশ্নকারী সংবাদমাধ্যমে, সাহিত্য-সংগীতে এবং সর্বোপরি সেই অধিকারে—যার মাধ্যমে আরোপিত সত্যকে প্রশ্ন করা যায়। তার সবচেয়ে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক সতর্কতা ছিল—সবচেয়ে বিপজ্জনক দমন হলো সেই দমন, যা নীরবতার ভেতর লুকিয়ে থাকে।
হাদির স্মৃতি তাই কেবল শোকের বিষয় নয়; এটি প্রতিরোধের স্মৃতি। একটি ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিতে স্মৃতিই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তাকে স্মরণ করা মানে ক্ষমতার নির্ধারিত বিস্মৃতির বিরুদ্ধে অবাধ্য হওয়া। ঢাকার ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার, হাদির কল্পনায় গড়ে ওঠা এক মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর, তার এই চেতনারই প্রতীক। তার মৃত্যুর পর সেই স্থান জাতীয় স্মরণবেদিতে রূপ নেয়—যেখানে নীরবতাই উচ্চস্বরে কথা বলে।
ওসমান হাদি আজও জীবিত তার রেখে যাওয়া প্রশ্নে। তিনি দেখিয়েছেন, সার্বভৌমত্ব নামমাত্র হতে পারে না; সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র নয়, মুক্তির ক্ষেত্র হতে হবে। ইতালীয় দার্শনিক উমবের্তো একোর ভাষায়, ফ্যাসিবাদ পার্থক্যের ভয়কে কাজে লাগিয়ে ঐকমত্য সৃষ্টি করে—এই সত্য হাদি অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি কেবল একজন সমালোচক নন; তিনি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক সততার প্রতীক, অবাধ্যতার আলোকবর্তিকা এবং সাহসের এক স্থায়ী আইকন।
ওসমান হাদির সংগ্রাম অসমাপ্ত বলেই তা আজও অর্থবহ। তার স্মৃতিতে শোক নয়, প্রয়োজন এগিয়ে চলা—নীরবতার মুখে কথা বলা, আরোপিত আনুগত্যের বিপরীতে চিন্তা করা এবং সংস্কৃতিকে ভয়ের নয়, স্বাধীনতার ক্ষেত্র হিসেবে রক্ষা করা।
আহমাদ সাব্বির একজন লেখক, সম্পাদক। প্রকাশিত গ্রন্থ : কিংবদন্তির কথা বলছি (ডকুফিকশন), জায়নামাজ (শিশু কিশোর গল্পগ্রন্থ), স্বপ্ন রঙিন দিন (কিশোর উপন্যাস), সলংগা (উপন্যাস), দুই ফালি চাঁদ (কিশোর উপন্যাস), সুবাসটুকু নিয়ো (গদ্য), মিথ্যা অনেক তেতো (শিশু কিশোর গল্পগ্রন্থ), আমার ঘুম আমার ইবাদত (আমল), উম্মু সালামা (ডকুফিকশন) বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত (অনূদিত), মাদরাসাজীবন (সম্পাদিত)।
