শহিদ ওসমান হাদি: এক সাংস্কৃতিক জাগরণের নাম
মারদিয়া মমতাজ, শিক্ষক ও প্রকৌশলী
মানুষ কখন কার প্রয়োজন অনুভব করে, এ প্রশ্নের উত্তর সবসময় সরল হয় না। অনেক সময় আমরা কাউকে হারানোর পর বুঝি, তিনি আসলে কত গভীরভাবে আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। শহিদ ওসমান হাদি ঠিক তেমনই একজন, যার প্রয়োজনীয়তা কেবল ব্যক্তিগত আবেগের জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জাতির চিন্তা, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত।
সংস্কৃতি কি? সমাজ বইয়ে পড়া সংজ্ঞা বলি। আমরা যা, তা ই আমাদের সংস্কৃতি। ব্যক্তি বা দলের যা আছে, তা তার সভ্যতা। সে যা করে, তা হল তাদের সংস্কৃতি। একটা সময় সভ্যতা সংস্কৃতি তৈরি করে, আবার অনেক সময় সংস্কৃতি সভ্যতা তৈরি করে। পৃথিবীর সব বড় বড় সভ্যতা নদীর তীরে তৈরি হয়েছে, পণ্য আনা-নেওয়া কিংবা যোগাযোগের সুবিধার জন্য সেখানে মানুষ বসতি করেছে। পেশাও বেছে নিয়েছে সে স্থানের উপযোগী। মানিকের 'পদ্মা নদীর মাঝি' কিংবা অদ্বৈত মল্লবর্মণের 'তিতাস একটি নদীর নাম' এ আমরা দেখেছি। জেলেপাড়ার মানুষ কী খায়, কেমন ঘর বানায়, কেমন করে বিয়ে দেয়, বিয়েতে কী যৌতুক হবে, সব ঠিক হয় তাদের সভ্যতার উপাদানের বিচারে।
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা
একটি বইয়ের আলোচনা শুনেছিলাম বহু বছর আগে। উপলব্ধি হয়েছিলো, “ইসলামী সংস্কৃতির মর্মকথা”, আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: আমরা যা করি, কেন করি? কেন ডান হাতে খাই, কেন ঘরে জুতো পরে ঢুকি না, কেন বড়দের সামনে কিছু আচরণ সংযত করি, এসব কি কেবল অভ্যাস, নাকি এগুলো আমাদের গভীরতর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা। সংস্কৃতি কেবল গান, নাটক বা পোশাক নয়; বরং এটি একটি জাতির চিন্তা, আচরণ, মূল্যবোধ এবং জীবনযাপনের সম্মিলিত রূপ। আর এই জায়গাতেই হাদির কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বুঝেছিলেন, একটি আদর্শ টিকিয়ে রাখতে হলে তার সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।
বিভক্তির ইতিহাস ও ঐক্যের প্রয়োজন
উপমহাদেশের ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, কীভাবে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে মানুষকে বিভক্ত করা হয়েছে। দ্বিজাতিতত্ত্বের বাস্তবায়ন, রক্তাক্ত ট্রেন, ছিন্নমূল মানুষের আর্তনাদ, এসব কেবল ইতিহাসের ঘটনা নয়, বরং আমাদের সাংস্কৃতিক ভাঙনের দৃষ্টান্ত।
এই প্রেক্ষাপটে হাদির চিন্তা ছিল ঐক্যের। তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ নিজেদের পরিচয় বুঝবে, অন্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। কারণ, নিজের পরিচয় না বুঝলে অন্যকে গ্রহণ করাও সম্ভব নয়।
রাজনীতি বনাম সংস্কৃতি: পরিবর্তনের আসল ক্ষেত্র
আমাদের সমাজে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা অনেক বলা হয়, কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কথা খুব কমই আলোচিত হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, রাজনীতি মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করলেও, সংস্কৃতি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে গড়ে তোলে।
একজন নেতা যদি উচ্চকণ্ঠে দেশপ্রেমের কথা বলেন, কিন্তু তার নিজের পরিবার, সমাজ সেই মূল্যবোধ ধারণ না করে, তাহলে সেই দেশপ্রেম টেকসই হয় না। একটি শিশুর কাছে ‘টুইংকেল টুইংকেল’ নয়, নিজের মাটির গল্প পৌঁছানো, এই ছোট ছোট কাজগুলিই আসলে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। আর এই কাজগুলোর জন্য প্রয়োজন হয় কিছু ‘নিয়মভাঙা’ মানুষ, যারা প্রচলিত ধারা ভেঙে নতুন কিছু গড়তে চায়। হাদি ছিলেন সেই দলের একজন।
ঈমান ও সংস্কৃতি: দ্বন্দ্ব নয়, পরিপূরক সম্পর্ক
অনেকেই মনে করেন, আগে ঈমান ঠিক করতে হবে, তারপর সংস্কৃতি। কিন্তু এই ধারণা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষের মন গড়ে ওঠে তার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, আর সেই অভিজ্ঞতা আসে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে, দেখা, শোনা, অনুভব করা।
ইসলামের শিক্ষা পদ্ধতিতেও এই বিষয়টি স্পষ্ট। মহানবী (সা.) কেবল কথার মাধ্যমে নয়, আচরণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ, শব্দ, সবকিছুর মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামকে তুলে ধরেছেন। আযানের ধ্বনি, আতরের সুবাস, খাবার ভাগাভাগি, এসবই ছিল একেকটি সাংস্কৃতিক উপাদান, যা মানুষের হৃদয়ে প্রভাব ফেলেছে।
অর্থাৎ, ঈমান একটি অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস হলেও, তার প্রকাশ ঘটে সংস্কৃতির মাধ্যমে। এই প্রকাশ না থাকলে, সেই বিশ্বাস অন্যের কাছে পৌঁছায় না, এমনকি নিজের সন্তানের কাছেও না।
আধুনিক উদাহরণ: সংস্কৃতির শক্তি
বিশ্বের বড় বড় আয়োজনগুলোর দিকে তাকালেও আমরা সংস্কৃতির প্রভাব দেখতে পাই। যেমন বিশ্বকাপ ফুটবল, এটি কেবল একটি খেলা নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী।
২০১০ এর আফ্রিকা কিংবা ২০২২ এর কাতার বিশ্বকাপ। কেবলই খেলা? কেবলই কিছু নাচানাচি? কেবলই সাংস্কৃতিক চর্চার একটা আয়োজন? সরল জবাব হল, না। একটা সামান্য গোলক, তাতে লাথি দিয়ে একটা গোলপোস্টে তাক্ মতো ঢুকিয়ে দেওয়ার সামান্য আয়োজনের চারপাশে কত বড় সভ্যতা তৈরি হয়েছে, কত বড় সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব হয়েছে, এর পরের সময়ের সভ্যতায় এর কি প্রভাব পড়েছে বুঝা খুব দরকার। কেন দরকার? পরে বলছি। দুই বিশ্বকাপের থীম সং খেয়াল করি। আফ্রিকার গানটার মূল শব্দগুলো নেওয়া হয়েছে ওদের যুদ্ধের গান থেকে, ওয়াকা ওয়াকা। প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকতে ওদেরকে যোদ্ধা হতে হয়েছে, আর তার পরে আছে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুরতা। ইতিহাসের বইয়ে 'অন্ধকার আফ্রিকা' এখনও খুব আলোকিত না। এমনকি বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে বাদ পড়ার সম্ভাবনাও ছিলো কেবল আর্থিক সামর্থ্য বিচারে।
অন্যদিকে এই যে কাতার বিশ্বকাপ, তার গানটায় সবাইকে বলা হচ্ছে, এসো স্বপ্ন দেখি। আরেকটা আনঅফিসিয়াল গান বানিয়েছেন আরব বিশ্বের হালের ক্রেজ, মাহের যাইন আর হুমূদ। গানের মূল কথা হল, হাইয়া - এসো৷ গানটার সবচেয়ে সুন্দর কথা আমার কাছে মনে হয়, 'বিসমিস সালাম', শান্তির নামে ডাকছি, এসো। পরিচ্ছন্ন গানটায় এই দুইজনের উদাত্ত হাসিতে শুধু সুন্দরের ডাক, মন খুশীর আয়োজন। অবাক হয়ে গানটা দেখছিলাম৷ বিট মারাত্নক, আপনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারবেন না, হাত পা ছুঁড়তে ইচ্ছা করবে৷ অথচ এক বিন্দু নির্লজ্জতা নেই, নারী শরীরের প্রদর্শন নেই এক সেকেন্ডের, অশ্লীলতার নামগন্ধ নেই। কাতারকেও কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে যেতে হয়েছে। একে আয়তনে ছোটো, তার ওপর কট্টর মুসলিম দেশ হিসেবে আয়োজনে নানা সীমাবদ্ধতা আছে, আদৌ পারবে কি না, এসব প্রশ্ন মোকাবেলা করতে হয়েছে। কাতার তাই ডেকে দেখাচ্ছে, এসো, দেখো, আমরা কি সাজিয়েছি।
উপস্থাপনের পার্থক্য দেখেন। আফ্রিকার উপজাতিদের সাথে মিলিয়ে যে পোশাক পরেছিলেন মূল গায়িকা শাকিরা এবং তার সহআর্টিস্টরা, তাকে পোশাক না বলে কয়েকটা টুকরোর জোড়াতালি বলা যায়। অবশ্য এদ্দিন পর্যন্ত বিশ্বকাপের নিয়মই তো তাই ছিলো। এখন বিশ্বকাপ শুধু খেলা না, মস্ত এক পুঁজিবাদী আয়োজন। মুনাফা লুটতে এখানে নির্লজ্জতার আসর বসানো হয়, চিয়ার লিডারদের শরীর দেখানোর টোপ ফেলে গ্যালারির টিকেট বিক্রি হয়। অথচ কাতার কি দুঃসাহসে এই বদনাম ঘুচিয়ে দিলো। শুধু গান না, গ্যালারিতেও সাংস্কৃতিক এই পার্থক্য পরিষ্কার। কোনও মেয়ে হাঁটু বা কাঁধ দেখানো পোশাক পরতে পারবে না, এ নিয়মই শুধু করে দেওয়া হয়নি। কড়াকড়িভাবে মানাও হয়েছে। নানা দেশের দর্শকরা এসেছেন, সিটের মধ্যে গিফট পেয়েছেন,সম্মানের সাথে নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করেছেন সমস্ত দেশে। মহিলারা আন্তরিকভাবে অবাক হয়েছেন, বিশ্বকাপের মওসুমে এ নিরাপত্তার আয়োজন তাঁদের জন্য অপ্রত্যাশিত। হ্যাঁ, কাতারের পয়সা আছে। তার ব্যবহারও তারা করেছে। স্থায়ী স্থাপনা করা যাবে না, এজন্য মস্ত ক্রুজ ভাড়া করে এনে ট্যুরিস্টদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঐশ্বর্য নয়, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে। প্রতি স্টেডিয়ামে স্বচ্ছ কাঁচের ঘরে নামাজের জায়গা রেখেছে, যেন সবাই দেখতে পায় মুসলিমরা আসলে নামাজের ঘরে কী করে। দাওয়াত দিয়ে বিশ্ববরেণ্য আলেমদের ডেকেছে, সবাইকে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে। সমস্ত দুনিয়াকে ডেকে এনে, বিবেকবোধকে পরিতৃপ্ত করে দেখিয়েছে, কেবল পাশবিক উল্লাসের মধ্যেই আনন্দ খুঁজতে হয় না, দুনিয়া আরও অনেক বড়। সামান্য অথচ মস্ত বড় ভূমিকা রেখেছে এই চাক্ষুষ সাক্ষ্য। একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক টুইট করেছেন, টয়লেটের পর পানি ব্যবহার আসলে কত বেশী স্বস্তিদায়ক। কয়েকজন ট্যুরিস্ট মেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে, কেউ তাদেরকে রাস্তায় আজেবাজে কথা বলছে না।
এই উদাহরণগুলো আমাদের শেখায়, সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়; এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যার মাধ্যমে একটি জাতি নিজেকে বিশ্বে উপস্থাপন করে।
শিশু, পরিবার ও সংস্কৃতির প্রভাব
একটি দুই বছরের শিশু যখন নামাজের ভঙ্গি অনুকরণ করে, সে ঈমান বুঝে না, সে দেখে এবং শেখে। একটি ছোট মেয়ে পুতুলকে মাথায় কাপড় দিয়ে ‘কুরআন পড়ানোর’ অভিনয় করে, এটিও সংস্কৃতির প্রভাব।
অন্যদিকে, একই বয়সের আরেকটি শিশু যদি ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার আচরণও ভিন্ন হবে। এখানেই বোঝা যায়, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস গঠনের প্রথম ধাপ।
বি জেড এম মোমতাজুল করিম
হাদি: এক অসমাপ্ত প্রয়াসের প্রতীক
হাদির উদ্যোগ, একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা, মাত্র শুরু হয়েছিল। কিন্তু তার এই প্রয়াসই আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়: আমরা কি নিজেদের চিনতে পেরেছি? আমরা কি বুঝতে পারছি, আমাদের সংস্কৃতি কোথায় যাচ্ছে?
অনেকে হয়তো ভাবেন, “তার কাজ আমার দরকার ছিল না।” কিন্তু বাস্তবে, এই ভাবনাটিই প্রমাণ করে, আমরা এখনো নিজেদের প্রয়োজন বুঝতে পারিনি।
আমাদের সবার প্রয়োজন হাদি
শহিদ ওসমান হাদি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি ধারণা, একটি আন্দোলন, একটি জাগরণের নাম। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, একটি জাতিকে বদলাতে হলে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ।
আমাদের পরিবার, আমাদের সন্তান, আমাদের সমাজ, সব জায়গায় যদি আমরা আমাদের মূল্যবোধকে জীবন্ত করে তুলতে না পারি, তাহলে কোনো আদর্শই টেকসই হবে না।
তাই বলা যায়, হাদির প্রয়োজন কেবল তার পরিবারের নয়, কেবল তার সহযোদ্ধাদের নয়; আমাদের সবার। কারণ, তিনি আমাদের সেই আয়নাটি দেখিয়ে গেছেন, যেখানে আমরা নিজেদের সত্যিকারের পরিচয় দেখতে পারি।
আমাদের সবারই দরকার হাদি, আমারও, আপনারও।
