সো জা রাজকুমারী: একটি সিলসিলার আখেরি মুখতার

এবাদুর রহমান

"সো জা রাজকুমারী সো জা

সো জা রাজকুমারী সো জা

সো জা মিঠে সপনে আয়ে

উড় কর রূপনগর মে জায়ে..."

বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে পাস্ট টেন্সে লিখতে পারবো না।

তিনি আমার শ্রেণী, আমার শ্রেণীর রুচি, বাঙালি ডিগনিটি, মুঘল আউটপোস্ট থেইকা আধুনিক রাজধানী হয়ে ওঠা ঢাকা শহরের মেট্রোপলিটানিজম, আর একটা হারিয়ে যাওয়া দুনিয়া ও ক্ষীয়মান সময়ের শেষ পাবলিক প্রতিনিধি। একই সাথে ১৯৪৭-পরবর্তী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান, শীতল যুদ্ধের সমীকরণ এবং তৃতীয় পৃথিবীর উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্রগঠনের জটিল আখ্যানে ইন্দিরা গান্ধী বা সিরিমাভো বন্দরনায়েকের থেকে বেগম জিয়ার অবস্থান ও অবদান আলাদা ও বিশিষ্ট।

এই কথাটা আমি বলতেসি, কয়েক প্রজন্ম ধরে ঢাকার অধিবাসী, একজন ডিফেন্স পরিবারের সন্তান হিসেবেই। আমার জীবনের প্রথম অধ্যায় ক্যান্টনমেন্টে কাটসে, এবং আমার মায়ের মতো ডিফেন্স ওয়াইফরা যে ভাবে নিজেদের ক্যারি করতেন, তাঁদের সংযত, মার্জিত আচরণ, পরিশীলিত কনভার্সেশন, প্রপার সামাজিক কেতা—এমনকি কোন পার্টিতে কাঁটা চামচ দিয়ে খাবার বিশেষ ভঙ্গির সাথে আমি পরিচিত। এইখানেও ১৯৭০ দশকের শেষ ও ১৯৮০-র শুরুর ঢাকায় বেগম খালেদা জিয়ার বিশিষ্টতা,আজকের ঢাকায় বোঝাই সম্ভব না। আমাদের অতি মনোরম, ভদ্রলোকদের মেট্রোপলিটন, আমাদের পুরাতন রঈস, আধুনিক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মিশ্র ভদ্রলোকি ঢাকাইয়া জগতে, যেখানে শৃঙ্খলা, শিষ্টতা, নীরব আত্মাভিমান আর মর্যাদাবোধ তখনো ছিল জীবনের মূল সুর; সেখানে বাংলা কথা বলার একটা বাচনভংগিমা ছিল,

ভদ্রপরিবারের পোশাক পরার একটা নির্দিষ্ট স্টাইল ছিল, ভদ্রপরিবারের মানুষের অন্য মানুষের সাথে মেশার একটা আদব ছিল,—আর বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন আমাদের এই পৃথিবীরই মানুষ। আমাদের চেনা মানুষ। আমাদের মানুষ।

এক। স্পর্শ ও সহ-অস্তিত্ব: একটি রাজনৈতিক উপস্থিতি

ছোটবেলায় বিমান বাহিনীর অফিসার্স ক্লাব ছিল আমাদের উঠোনের মতো। ওই ক্লাবের পুকুরে আমি বাবা বা বাবার বন্ধুদের কোলে বসে মাছ ধরসি।

এই ক্লাবে, পিচ্চিকালেই, আমি বিলিয়ার্ড খেলা শিখসি। এখানেই ওল্ড ফৌজিয়ানদের রিউনিয়ন বা অন্য কোন অনুষ্ঠানে,

কর্নেল জিয়া ও বেগম জিয়া আমাকে আদর করসেন। অনেকেই করসেন, আমার মতো পিচ্চিদের সবাইকেই করসেন, আর এইটা বলতেসি, সেই সময়ের ঢাকাকে বোঝাইতে, আমাদের সমাজের অদ্ভুত শান্ত সৌন্দর্যকে বোঝাইতে। মিঠাপন বুঝাইতে। ফৌজি বা অফিসাররা তখন কঠিন সময় অতিক্রম করতেসেন, দেশে অভাব; একটার পর একটা ক্যু হইতেসে; নদী দিয়া ভাইসা যায় অনাম্নী বিপ্লবী আর তরুণ অফিসারদের লাশ;কিন্তু, বাঙালিদের অনমনীয়, দৃঢ় মনোবল ও ব্রাদারহুড, বিশেষতঃ জাতি গঠন প্রক্রিয়া ছিলো অব্যাহত। এই প্রক্রিয়ায়, সে সময়ের অগ্নিপুরুষদের তরুণী, অনিন্দসুন্দরী ভার্যাদের যে কি অপরিসীম অবদান, আমরা সেইটা নিয়ে কোন গবেষণা বা কাজই করিনি।এই ফ্রন্টেও বেগম জিয়ার নীরব কিন্তু প্রবল উপস্থিতি নিয়ে কোন আলাপ আমরা কখনো করিনি।

সাউথ এশিয়া জার্নালের একটা লেখায় পড়সিলাম, ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের নূতন অফিসার্স ক্লাবের উদ্বোধনে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা স্মৃতিচারণ করসেন: 'অন্য সব ডিফেন্স ওয়াইফরা ম্লান হয়ে গেসিলেন,যখন বেগম জিয়া ঘরে প্রবেশ করলেন কর্নেল জিয়ার সাথে।

অন্য কেউ তাঁর সৌন্দর্য, কমনীয়তা আর ব্যক্তিত্বের কাছাকাছিও কখনো আসতে পারেনি।'

এক বিমান পরিচারিকা লিখেছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়া খুব কম মেকআপ ব্যবহার করতেন,

কিন্তু তাঁর উপস্থিতি ছিল জাদুর মতো—সবসময় মার্জিত, সবসময় মহিমান্বিত।

আমি বেগম খালেদা জিয়াকে এভাবেই মনে রাখতে চাই, তিনি এক আরবেইন, মহানগরীয় রুচি আর মর্যাদার শান। তাঁকে আমি কখনোই দিনাজপুরের 'পুতুল' হিসেবে চিনতে পারি নাই,বরং তিনি ছিলেন সেই আরবেইন, সফিস্টিকেটেড মুসলিম ভার্যা, যিনি করাচি থেকে ঢাকা, ক্যান্টনমেন্ট থেকে গণভবন,

সর্বত্র নিজের একটা আলাদা “প্রেজেন্স” তৈরি করসেন।

কিন্তু কি এই প্রেজেন্স?

তাঁর শরীরী উপস্থিতি স্পর্শ কি ভাবে বিশিষ্ট এই প্রেজেন্স নির্মাণে?

জাঁ-লুক ন্যান্সি তাঁর Corpus গ্রন্থে বলেছেন যে সত্তার মূল ভিত্তি হলো স্পর্শ—toucher—এবং এই স্পর্শ কোনো মিলনের মুহূর্ত নয়, বরং এটি সেই ক্ষণ যেখানে দুটি পৃথক অস্তিত্ব একে অপরের সীমানায় এসে থামে, স্বীকার করে যে মধ্যখানে একটি অতল ফাঁক আছে।

রাজনৈতিক সম্প্রদায় গড়ে ওঠে এই স্পর্শের ভেতর দিয়ে—কোনো একক পরিচয়ের আরোপণে নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন শরীরের পারস্পরিক স্বীকৃতিতে।

এই তত্ত্বের আলোয় বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক উপস্থিতিকে নতুনভাবে পড়তে হয়।

১৯৭২ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স ক্লাবে তিনি যখন প্রবেশ করলেন, সেই মুহূর্তে যে নিস্তব্ধতা নেমে আসলো—সেটি কেবল সৌন্দর্যের প্রতি বিস্ময় ছিল না।

ন্যান্সির ভাষায়, সেটি ছিল এক singular plural মুহূর্ত: একটি দেহের উপস্থিতি যা অন্য সমস্ত দেহকে তাদের নিজস্ব সীমায় ফিরিয়ে দিল। করাচির আধুনিক মেট্রোপলিটান জীবনের এক্সপোজার, সামরিক পরিবারের অনুশাসন এবং এক সহজাত অন্তর্মুখী আত্মাভিমান—এই তিনের সমন্বয়ে গঠিত তাঁর দেহ-ভাষা, তাঁর পোশাক ও উপস্থাপনা, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি—এই সবটা মিলিয়ে তিনি শুধু একজন সুন্দরী রমণী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি somatic community-র কেন্দ্রবিন্দু। যে সমাজ কাঠামো আমরা হারিয়ে ফেলেছি—সেই পরিশীলিত, সংযত, মর্যাদাসম্পন্ন যে বাঙালি মুসলিম ভদ্রলোকি জগত—তিনি ছিলেন তার জীবন্ত দেহ।

হুমায়ুন আজাদ তাই নিষ্ঠুর নির্ভুলতায় লিখেছিলেন: তাঁর প্রথম পরিচয় সে রূপসী, রাজনীতি তাঁর দ্বিতীয় পরিচয়।

এটি আপাতদৃষ্টিতে একটি আপত্তিকর উক্তি; কিন্তু ন্যান্সির দেহতত্ত্বের আলোয় এটি একটি গভীর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ।

কারণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব যেখানে সংকটগ্রস্ত, যেখানে প্রতিষ্ঠান ভঙ্গুর এবং রাষ্ট্র অবিশ্বাস্য, সেখানে দেহই হয়ে ওঠে বৈধতার সবচেয়ে আদিম ও অকাট্য উৎস। তাঁর উপস্থিতি এক স্পর্শ দিয়ে বলে দিত: এই দেশের একটি নির্দিষ্ট মানবিক মূল্যক্রম এখনো বিদ্যমান, এখনো জীবিত।

দুই। প্রতিপক্ষের সাথে নৈতিক সম্পর্ক

ইমানুয়েল লেভিনাস বলেছেন যে নৈতিকতার কোর মুহূর্ত হলো অপরের মুখের সামনে দাঁড়ানো; সেই মুখ যা আমাকে আদেশ করে: তুমি আমাকে খুন করবে না। 

লেভিনাসের নৈতিকতা হলো এই অসম সম্পর্কের স্বীকৃতি, যেখানে আমি অপরকে আমার প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং একটি অলঙ্ঘনীয় মুখ হিসেবে দেখতে বাধ্য। এই মুখকে আক্রমণ করা হলো নৈতিকতার মৌলিক লঙ্ঘন।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত আক্রমণের বিপরীতে তাঁর নীরবতা। দশকের পর দশক ধরে তাঁর বিরুদ্ধে যে পরিমাণ ব্যক্তিগত কুৎসা রটানো হয়েছে: তাঁর বিবাহ, তাঁর পারিবারিক জীবন, তাঁর জন্মতারিখ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, তার বিপরীতে তিনি কখনো সমান মুদ্রায় জবাব দেন নাই।

এটি দুর্বলতার চিহ্ন ছিল না, বরং এটি ছিল এক গভীর এথিকাল অবস্থান।

তিনি যেন বুঝতেন, অপরের মুখ, এমনকি শত্রু অপরের মুখকেও, ব্যক্তিগত অবমাননার পর্যায়ে নামিয়ে আনলে রাজনৈতিক লড়াই পরিণত হয় একটি নাক্কারজনক অনৈতিক ন্যাংটা নাচে পর্যবসিত হয় , যেখানে দিনশেষে দুইপক্ষকেই জিল্লতির শিকার হইতে হয় ।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে পাঁচ মাস বন্দিত্ব, দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে, স্বামীর মৃত্যুর আতঙ্ক বুকে নিয়ে, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি বিশেষ নৈতিক কঠোরতা দিয়েছিল। যে মানুষ সত্যিকারের ভয়কে মুখোমুখি দেখেছেন, তিনি জানেন যে ব্যক্তিগত আক্রমণের ভাষা কতটা তুচ্ছ। লেভিনাসের ভাষায়, তিনি যেন শিখে নিয়েছিলেন il y a—সেই আদিম নৈঃশব্দ্য ও অস্তিত্বের ভার—এবং সেই শিক্ষা তাঁকে দিয়েছিল এক অপরিমেয় ধৈর্য।

তিন। 'অপোশীন নেত্রী'র জন্ম

ইউর্গেন হেবার্মাস তাঁর Theory of Communicative Action-এ বলেছেন, গণতান্ত্রিক বৈধতার শর্ত হলো এমন একটি জনপরিসর যেখানে যুক্তির মাধ্যমে ঐকমত্য তৈরি হয়, কোনো কর্তৃত্বের আরোপণে নয়। কিন্তু যখন এই পরিসরটি ক্ষমতা ও অর্থের system-এর দ্বারা উপনিবেশিত হয়, যখন নির্বাচন পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় প্রতারণার মঞ্চে, তখন সৎ রাজনৈতিক অভিনেতার একমাত্র নৈতিক পথ হলো সেই বিকৃত মঞ্চকে প্রত্যাখ্যান করা।

১৯৮৬ সালে এরশাদ যখন নির্বাচন ঘোষণা করলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, তখন আওয়ামী লীগ, জামায়াত এবং বামপন্থী শক্তিগুলো সেই নির্বাচনে অংশ নিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া বললেন, এই মঞ্চে প্রবেশ করা মানেই হলো স্বৈরাচারকে বৈধতা দেওয়া। হেবার্মাসের পরিভাষায়, তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন একটি systematically distorted communication-এ অংশগ্রহণ।

সেই নির্বাচন কারচুপি হইলো, হাসিনাকে জেলে গেল, এবং বাংলাদেশ বুঝল যে বেগম জিয়া সঠিক ছিলেন।“ আপসহীন নেত্রী” এই অভিধাটি সেদিন থেকে তাঁর নামের সাথে যুক্ত হয়ে গেল; এটি কেবল একটি রাজনৈতিক উপাধি নয়, এটি একটি নৈতিক সার্টিফিকেট।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সাতবার গৃহবন্দিত্ব সত্ত্বেও তিনি আন্দোলনে ফিরে আসতেন। এই ফিরে আসার মধ্যে ছিল একটি হেবার্মাসীয় জেদ: আমি জনপরিসর ছেড়ে যাবো না, কারণ এই পরিসরটি আমার নয়, এই পরিসরটি নাগরিকদের।

তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে টেলিভিশনে দুই নেত্রীর ভাষণ। বেগম খালেদা জিয়া কথা বললেন, সংযত, স্পষ্ট, গরিমাময়। শেখ হাসিনার ভাষণে ছিল উত্তাপ ও আবেগ; খালেদা জিয়ার ভাষণে ছিল এক communicative rationality-র শান্ত দৃঢ়তা। বুদ্ধিজীবীরা ধরে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ জিতবে। কিন্তু বাংলার মানুষ সেই মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়ার ওই ভাষণে দেখলেন একটি ideal speech act—যেখানে বক্তা কৌশল খাটাচ্ছেন না, বক্তা কেবল সত্য বলছেন।

২০ মার্চ ১৯৯১, খালেদা জিয়া শপথ নিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

তাঁর প্রথম সরকারের অর্জনগুলো এখন ইতিহাসের পাতায় আছে: প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও বিনামূল্যে; মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, এসএসসি পাসের হার মাত্র পাঁচ বছরে ৩১% থেকে ৭৩%-এ উন্নীত, ভ্যাট প্রবর্তন, প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড প্রতিষ্ঠা, গার্মেন্টস রপ্তানির ভিত্তি স্থাপন। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে সার্কের চেয়ারম্যান হলেন। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের বাইরে তাঁর প্রকৃত অবদান ছিল হেবার্মাসের lifeworld-এ একটি মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশি পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

চার। জামায়াত জোট, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ভূ-রাজনীতির ফাঁদ

২০০১ সালের বিশ্বটা ২০২৫ সালের দৃষ্টি দিয়ে বিচার করলে চলবে না। নাইন-ইলেভেনের পর ওয়াশিংটন যখন পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করছে, আপনি হয় আমাদের সাথে, নয় সন্ত্রাসীদের সাথে; তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনীতিও এক নতুন টানাপোড়েনে পড়েছে। দেশের জনমিতি দ্রুত পাল্টাচ্ছে: মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, গ্রামীণ ইসলামি চেতনার বিস্তার ঘটছে, মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থ সাথে আনছে একটি ভিন্ন সামাজিক আকাঙ্ক্ষা। এই পরিবর্তিত জনমিতির বাস্তবতায় বিএনপির জামায়াত-জোট ছিল একটি নির্বাচনী বাস্তবতার স্বীকৃতি।এই দ্বিতীয় মেয়াদে একটা বিষয় লক্ষণীয়: বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের উপরে রইল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তিন বিলিয়ন ডলার ছাড়াল, শিল্পখাত এগিয়ে গেল। ফোর্বস ২০০৫ সালে তাঁকে বিশ্বের ২৯তম ক্ষমতাবান নারীর তালিকায় রাখল।

 কিন্তু এই উন্নয়নের সাথে সাথে চললো হাওয়া ভবনের সমান্তরাল ক্ষমতার উদয়: পুত্রের কর্তৃত্ব, দলীয় দুর্নীতির মোচ্ছব। রাষ্ট্র আবারো lifeworld-কে গ্রাস করতে শুরু করলো, এবার বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে।

পাঁচ। ১/১১-এর মহাযজ্ঞ

Of Hospitality-তে, জাক ডেরিদা  দুই ধরনের আতিথেয়তার কথা বলেছেন: শর্তযুক্ত আতিথেয়তা, যেখানে গৃহস্বামী অতিথিকে তার শর্তে গ্রহণ করেন এবং নিঃশর্ত আতিথেয়তা, যেখানে দ্বার খুলে দেওয়া হয় প্রতিদান বা নিরাপত্তার প্রত্যাশা ছাড়াই। কিন্তু ডেরিদার সবচেয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণটি হলো: আতিথেয়তার সম্পর্ক সবসময় বিপরীতমুখী হতে পারে। গৃহস্বামী নিজেই একদিন অতিথি হয়ে যেতে পারেন নিজের গৃহে, যদি ক্ষমতার সম্পর্ক উল্টে যায়।

জানুয়ারি ১১, ২০০৭।

বাংলাদেশে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব। তাদের গোপন ফর্মুলা: মাইনাস-টু। দুই নেত্রীকে সরিয়ে দিলে, রাজনীতিকে 'সংস্কার' করা যাবে।বেগম খালেদা জিয়াকে বলা হলো সৌদি আরব চলে যেতে—এক মর্যাদাপূর্ণ নির্বাসন।

বেগম জিয়া গেলেন না।

এই না-যাওয়াটুকু বোঝার জন্য ডেরিদার threshold-এর ধারণাটি দরকার। দহলিজ—গৃহের সীমানা—আসলে গৃহস্বামীর সার্বভৌমত্বের চিহ্ন। যে মুহূর্তে বেগম জিয়া বাংলার মাটি না ছেড়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, সেই মুহূর্তে তিনি ঘোষণা করলেন: এই দেশের মাটিই আমার গৃহ, এই মাটির দহলিজ আমি পার হবো না নির্বাসনে গিয়ে। তিনি সেই নিঃশর্ত আতিথেয়তা দিলেন বাংলাদেশকেই, নিজেকে বন্দি করে, নিজের স্বাধীনতাকে বন্ধক রেখে। সৌদি আরব জানালো: তারা অনিচ্ছুক নির্বাসিতকে নিতে চায় না।

এখানেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক গভীর আয়রনি।

বেগম জিয়ার এই দৃঢ়তা, মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনকে সম্ভব করে তুলল। যখন মাইনাস-টু ফর্মুলা ভেঙে পড়লো, যখন আন্তর্জাতিক চাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বুঝলো যে কোনো একজনকে রেখে অন্যজনকে নির্বাসনে রাখা যাবে না, তখন দুজনকেই নির্বাচনে ফিরতে দেওয়া ছাড়া উপায় রইল না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়, হাসিনার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন, এই পুরো আখ্যানের একটি অদৃশ্য শর্ত হলো বেগম জিয়ার সেই বাংলার মাটি ছেড়ে না-যাওয়া।

বলা যায়, বেগম জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিসরকে তাঁর দেহ দিয়ে ধরে রেখেছিলেন।

তিনি কারাগারে গেলেন, কিন্তু মাটি ছাড়লেন না। তাঁর অসুস্থ শরীর যখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একা পড়ে ছিল, অন্য সমস্ত কয়েদিদের সরিয়ে তাঁকে একমাত্র বাসিন্দা করা হয়েছিল; সেই একাকিত্বেও তিনি দেশ ছেড়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাননি। পরিবার বারবার অনুমতি চেয়েছে, হাসিনার সরকার বারবার না বলেছে; এবং এই সময়কালে কারো মনে সন্দেহ থাকেনি যে তিনি চাইলে অন্য পথে যেতে পারতেন। ছেলে তারেক লন্ডনে, ছোট ছেলে আরাফাত মৃত্যুশয্যায় থাকার সময় তাঁকে সাথে থাকতে দেওয়া হয়নি, মৃত্যুর পরে দেখতে পেয়েছেন, তবু তিনি গেলেন না। ডেরিদার ভাষায়, তিনি অতিথির ভূমিকা নিতে অস্বীকার করলেন। তিনি গৃহস্বামী হিসেবেই রইলেন—বন্দী গৃহস্বামী।

ছয়। একটি রূপান্তরিত জনমিতি ও বিলুপ্ত সিলসিলা

বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও মৃত্যুকে বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ জনমিতিক রূপান্তরের পটভূমিতে না দেখলে তাঁকে বোঝা যাবে না।

১৯৭০ ও ৮০-র দশকে ঢাকায় যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিদ্যমান ছিল, শিক্ষিত, সামরিক-বেসামরিক পেশাজীবী, শহুরে কেতার উত্তরসূরি, সেই শ্রেণি আজকের ঢাকার জনবিন্যাসে ক্ষীয়মান। গার্মেন্টস শিল্পের বিস্তারে উঠে আসা নতুন শ্রমজীবী শহুরে শ্রেণি, মধ্যপ্রাচ্য প্রত্যাগত রেমিট্যান্স-সম্পন্ন পরিবার, মাদ্রাসা-শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম, এই নতুন বাংলাদেশে বেগম জিয়ার প্রতিনিধিত্ব করা পুরোনো বিশ্বটির কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক ভাষা আর নেই।

হেবার্মাসের lifeworld ধারণায় ফিরি।

তিনি বলেছেন, সমাজের lifeworld—তার ঐতিহ্য, তার মূল্যচেতনা, তার সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া, যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিস্টেম -এর দ্বারা ধ্বংস হয়, তখন মানুষ তার সাংস্কৃতিক শিকড় হারিয়ে ফেলে এবং পাথলজিকাল সামাজিক প্রপঞ্চের শিকার হয়। বাংলাদেশের পুরনো ভদ্রলোকি ঢাকাইয়া মধ্যবিত্তের lifeworld—তার পরিশীলিত বাংলা, তার মর্যাদাবোধ, তার শৃঙ্খলা ও সিভিক সেন্স সেই lifeworldটা ভেঙে গেছে আঘাতে আঘাতে।

বেগম জিয়া ছিলেন সেই বিলুপ্ত জগতের শেষ জীবন্ত রাজনৈতিক  প্রতিনিধি। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর প্রতি মানুষের আবেগ শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, এটা একটা হারানো সংস্কৃতির জন্য শোক।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে তাঁর সার্বভৌমতার দাবিটা এই একই lifeworld-এর সম্প্রসারণ ছিল ব্যক্তি থেকে জাতিতে। তিনি বলতেন এবং তাঁর বলার ভঙ্গিটা গুরুত্বপূর্ণ: আমরা সকলের সাথে বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু প্রভুত্ব মানবো না। এই কথাটা কোনো আদর্শবাদী বুলি ছিল না; এটা ছিল একটি শ্রেণির, একটি সংস্কৃতির, একটি জীবনযাপনের মর্যাদাবোধের রাজনৈতিক ভাষান্তর।

শেষ কথা: বিদায় না, বরণ

আমি রাজনীতির গবেষক নই। আর, রাজনীতি নিয়ে কথা বলার কোন রুচি আজকে নাই। আমি লিখছি এমন একজন হিসেবে, যার শ্রেণি-স্মৃতি, যার প্রথম সামাজিক জ্ঞান, যার বোঝার শুরুটা হয়েছিল সেই পৃথিবীতে যেখানে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন আমাদের মানুষ।

ন্যান্সির স্পর্শ, লেভিনাসের মুখ, ডেরিদার দহলিজ, হেবার্মাসের জনপরিসর, এই সমস্ত তাত্ত্বিক কাঠামো আমি ব্যবহার করেছি কারণ তাঁর মতো একজন মানুষকে বোঝার জন্য কেবল রাজনৈতিক ইতিহাস যথেষ্ট নয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে থেইকা ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারিপর্যন্ত তাঁর অমানুষিক জার্নিটা খালি কল্পনা করেন: এই দেশের রাজনীতি তাঁকে খুঁজতে এসেছিল, তিনি রাজনীতি বা ক্ষমতা খুঁজতে যান নাই।কি ভয়ঙ্কর শোকের, কি ছোট আর অনাড়ম্বর তাঁর শুরু;কিন্তু, ১৯৮৪ সালে যখন তিনি দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হৈসেন, তখন ক্লিয়ার বুঝা গেল, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটা নূতন শক্তিকেন্দ্রের উত্থান ঘটসে।

তাঁর ১৯৮২ থেকে ১৯৯০-এর মহাকাব্যিক সংগ্রাম টা খেয়াল করেন।খেয়াল করেন যে তাঁর জীবন একটি দার্শনিক প্রশ্নও: একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রে, পরিবর্তিত জনমিতিতে, ভূ-রাজনীতির ফাঁদে,

কে সত্যিকার অর্থে মর্যাদার সাথে বাঁচে?

কে নিজের মাটি ছাড়ে না?

কে ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে নিজের নৈতিক সততা রক্ষা করে?

যাক, আর বেশি কথা না বলি; এইটাই বুঝাইতে চাইসিলাম যে, বেগম খালেদা জিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার এক বিশেষ রাজনৈতিক ঘরানা

এবং একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক-সাংস্কৃতিক পৃথিবীর শেষ পাবলিক প্রতিনিধি। তাঁর না থাকা, আমার মতো অনেকের জন্য

আমাদের জন্মভূমির একটা চিহ্ন, অবসিত হয়ে যাবার মত।

তাঁর সাথে সাথে আমাদের পুরাতন পৃথিবী অনেকটাই হারায় গেলো।

আমাদের পুরাতন পৃথিবী ধরে রাখার নোঙ্গর ছিঁড়ে গেল।

আমরা উম্মুল হয়ে গেলাম অনেকটাই।

তাঁর সাথে সাথে আধুনিক বাঙালি মুসলিম সমাজের মূল্যবোধের অবচেতন আধার অনেকটাই হারায় গেলো। আমাদের নিজস্ব পৃথিবীর ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্য ধরে রাখার সিলসিলা ছিঁড়ে গেল। তিনি ছিলেন সেই রুচি, সেই মর্যাদা, সেই রাজনীতির ধারক যা আর সাউথ এশিয়ার রাজনীতিতে এক্সিস্ট করে না।

লিখতে লিখতে কল্পনা করতেসি তাঁর শিয়র-পাশে কুন্দনলাল সায়গল বসে আছেন, বিমর্ষ। সায়গল গাইতেসেন সেই ঘুম পাড়ানি গান, যা এক হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর আবেশ জাগায়:

সো জা রাজকুমারী সো জা / সো জা মিঠে সপনে আয়ে / সপনো মে পিয়া দরশ দিখায়ে / উড় কর রূপনগর মে জায়ে / সো জা রাজকুমারী সো জা...

ঘুমাও রাজকুমারী, ঘুমাও। এই ঘুমে মধুর স্বপ্ন আসবে, স্বপ্নে তোমার প্রিয়জনরা ফিরে আসবেন। উড়ে যাও সেই সৌন্দর্যের নগরে, যেখানে আর কোনো কষ্ট নেই, কোনো বেদনা নেই, কোনো অবমাননা নেই। দুঃখিনী মায়ের সন্তানদের ইনসাফের জন্য, আমাদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জং জারি রাখসিলা—তুমি প্রচণ্ড মর্যাদার সাথে বাঁইচা ছিলা এই দুনিয়ায়, আর দেশবাসীকে কান্দাইয়া, সবার কাছ থেকে সম্মান ও ভালোবাসা আদায় কইরাই ওফাত বরণ করলা।

সো জা রাজকুমারী সো জা।

আমাদের দুঃখিনী বাংলার শেষ রাজকুমারী, চিরনিদ্রায় শান্তিতে সমাহিত থাকো।

আমিন।