Milestones

Commentary on the Islamic World

  • Articles
  • Interviews
  • Symposia
    • Ethnography #9
    • Shapla: 10 Year Anniversary
    • A Sense of Brutality
  • Reviews
  • Multimedia
  • Visual Essays
  • Reflections
    • War on Gaza, 2023
    • Razakarnama
    • Against Indian Hegemony
  • Submissions
  • about

Image credit: Paul Hoi

এপিলগ: দাস-আইন (Dasein)

August 08, 2026 by Tanzeen Doha

  তানজীন রাশিদ দোহা  

"This question [of Being] has today been forgotten." - Martin Heidegger, Being and Time এর ভূমিকার প্রথম লাইন।[1] 

"আমি কে, তুমি কে? রাজাকার রাজাকার।" - জুলাই সংগ্রামীদের প্রথম লাইন।     

এই এপিলগ পড়ার আগে কয়েক মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করেন। ভাবেন আপনি ১৯১৯ সালে জার্মানির ফ্রেইবার্গ ইউনিভার্সিটি। আপনি একজন মেধাবী গ্রাজুয়েট ছাত্র। কনশাসনেস, ট্রান্সেন্ডেন্স, সত্যের ঐতিহাসিক আবির্ভাব, চিন্তার গঠন/কাঠামো, অস্তিত্বের সাথে খোদার সম্পর্ক, জীবন এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে সময়ের প্রভাব, এই সবকিছু আপনার ভাবনার দুনিয়া। আপনি দর্শনের সেমিনার নিসেন। আপনার প্রফেসর এডমান্ড হুসার্ল। হুসার্ল সেমিনার রুমে ঢুকেন ওই সময়কার ক্লাসিক জার্মান দার্শনিকদের মতো: গোলগোল চশমা, সিরিয়াস, সেমিনার রুমে আইসা টুপি খুইলা রাখেন, মাঝে মাঝে পাইপ টানেন, এমন গভীর চিন্তা করেন যে অনেক সময় কথা বলতে বলতে হারায়া যান। হুসার্ল আপনাকে সব দুনিয়াবী কালচারাল ব্যাপার-শেপার ব্র্যাকেটের মধ্যে রাইখা চিন্তা করতে শিখান। আহ! ট্রান্সসেন্ডেন্টাল রিডাকশন। বাইরের জগতের মায়েরে বাপ! আপনি ফোকাস করবেন একদম আপনার সামনের অভিজ্ঞতার উপর: কনশাসনেসের নিজস্ব স্ট্রাকচারটা আসলে কি? এইটা আপনি বুঝতে চান। সেমিনার কয়েক সপ্তাহব্যাপী চলার পর একদিন ক্লাসরুমে প্রফেসর হুসার্লের সাথে আরেকজন ব্যক্তি আসলেন। সে প্রায়ই আপনার বয়সী। হুসার্ল সেমিনারের ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয় করায়া দিলেন। বললেন, ওনার নতুন অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং অ্যাডভান্সড ছাত্রের নাম মার্টিন হাইডেগের। বাকি সেমিস্টার আপনি চিন্তার ইতিহাসে, বিশেষ কইরা ফেনোমেনোলজিতে এক ধরণের বিপ্লব দেখলেন। গুরুর সাথে শিষ্যের ফান্ডামেন্টাল মতপার্থক্য। হুসার্ল জানে যে হাইডেগের দর্শনের দুনিয়া কাঁপাবে কিন্তু কনসার্নড যে হাইডেগের চিন্তা করতে করতে দর্শনই ছাইড়া দিবে। হুসার্ল এক দিক দিয়া ঠিকই অনুমান করলেন। হাইডেগেরের পরের একটা লেকচারের নাম "The End of Philosophy and the Task of Thinking"[2] যেইখানে তিনি বুঝাইসেন কেমনে দর্শন প্রি-সক্রেটিক যুগে না যাইতে পারলে সারাজীবন অধিবিদ্যায় আটকায়া থাকবে, দর্শন একটা টুল বা ইন্সট্রুমেন্টে পরিণত হবে। যাই হোক, হুসার্ল তার ছাত্র হাইডেগেরকে একদিন সেমিনারে বললেন,  "তুমি তো আর দর্শন করো না , তুমি দেখি এনথ্রোপোলজি করো!" দার্শনিকদের জন্য, বিশেষত ফেনোমেনোলজিস্টদের জন্য এনথ্রোপোলজি একটা গালির মতো। সত্য নিয়া না ভাইবা, বিশুদ্ধ অন্টোলজি নিয়া না ভাইবা, শুধু এম্পিরিক্যাল ডাটা টোকায়া বেড়ানো। হুসার্ল যখন হাইডেগেরকে এই কথা বলসিলেন তখন সে ছাত্র। ১৯২৭ সালে যখন হাইডেগের তার ম্যাগনাম ওপাস Being and Time প্রকাশ করলেন তখন হুসার্ল বললেন: "আমি প্রথম পেজ খুলসি। তারপর সাথে সাথে বন্ধ করসি। এই বই একটা বিস্ফোরণ! আমার সময় লাগবে।"[3]

Being and Time এ Dasein এর উপর কথা বলসেন হাইডেগের। যা আছে, যা থাকে তা বিশুদ্ধ সত্যের ঠিকানায় বাস করে কি না, থাকতে পারে কি না, আছে কি না — সেইটার পর্যালোচনা। এই Dasein এর মানে শুধুমাত্র কর্তাসত্তা দিয়া বুঝা যায় না। এইটা ইন্ডিভিজুয়ালে রিডিউস করা যায় না। একজন তার পরিচয়, তার কর্তাসত্তা, নিজের কনশাসনেস, নিজের অভিজ্ঞতার এম্পিরিক্যাল এভিডেন্স পর্যালোচনা করা আর Dasein বুঝা এক জিনিষ না। Dasein — কর্তাসত্তাকে অনুমান কইরা আগায় না, কারণ ওই অনুমান অধিবিদ্যার উপর নির্ভরশীল। যা আছে তা নিক্ষিপ্ত হয় যেইখানে সে নিজেকে পায় সেইখানে। এই নিক্ষিপ্ত হওয়ার (thrownness) পর Dasein সবসময় এক ধরণের সম্পর্কের মধ্যে নিজেরে পায়। এইডা আপনার বউ এর সাথে সম্পর্কের মতো না। এই সম্পর্ক সম্পর্কতা জিনিষটাকে এড্রেস করে। এই রিলেশনালিটি আপনি কি ভাবে আছেন তা নির্ণয় করে। এই থাকা হইলো ফান্ডামেন্টাল অন্টোলজির ব্যাপার। কিন্তু এই থাকা যখন শুধুমাত্র পসিটিভিস্ট ডাটা হয়, আপনার রিডিউসড অভিজ্ঞতা হয়, আপনি যদি ব্রডলি এই থাকা কেন থাকে কিভাবে থাকে তা ধরতে না পারেন তাইলে এইটা হইলো ontic একটা থাকা। তো ধরেন আপনে যদি মনে করেন আপনার নাম অমুক, আপনার ইতিহাস শুরু হইসে ৭১ এ, মুক্তিযুদ্ধ আপনার সব, একটা উদার সংবিধানে সাম্য লিখলেই আপনে নাগরিক, আপনে সাবজেক্ট, তাইলে আপনে বেসিকালি ontic রিয়ালিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আপনি ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের যেই ইন্সট্রুমেন্টাল reason তার শিকার। লিবারেল রাজনৈতিকতা নির্ভর করে প্রতিনিধিত্বমূলক চিন্তার উপর। হাইডেগেরের Dasein হইলো Being-in-the-world এবং চিন্তা আর জমিনের সম্পর্কতা। চিন্তা একটা যন্ত্র না বরং চিন্তা এক ধরণের unconcealment। চিন্তা আস্তে আস্তে আপনার সাথে মাটির এবং দুনিয়ার সম্পর্ক খোলসা করে, গতানুগতিক "সত্যের" মুখোশ খুইলা পরে, আর আপনি আপনারে খুইজা পান সত্যের ঘরের অন্তরতম কামরায়।                              

হাইডেগেরের Being and Time বইয়ের মধ্যে যেই মাল আসে এইডা তথাকথিত অস্তিত্বের গ্রাউন্ড উড়ায়া দিতে পারে। আপনার চিন্তার জগতের অনুমানগুলা সব চূর্ণ বিচূর্ণ কইরা ফালায়। আপনি বুঝেতে শুরু করেন আপনি কিছুই বুঝেন না। আপনার জানা যা সত্য সব আসলে পপুলার গুজব। আপনি নিজে কি আপনে জানেন না, আপনার হাল কি আপনি জানেন না। হুসার্ল এই জন্যই হাইডেগেররে নিয়া বাটে পরসিলো। না পারসিলো ছাড়তে, না পারসিলো ধরতে। যাই হোক: জুলাইয়ের পর আমাদের জন্য অন্টোলজিক্যাল প্রশ্ন তোলা কেনো জরুরী? জুলাই কি এমন একটা ঘটনা যা আমাদের জোস্ উঠায়া দেয় মৌলিক অন্টোলজিক্যাল প্রশ্ন তোলার এবং ভাবার? আমি মার্টিন হাইডেগেরের প্রধান কনসেপ্ট জার্মান শব্দ Dasein কে লিখসি বাংলায় "দাস-আইন"[4] হিসাবে। তারপর ব্র্যাকেটে Dasein রে কাইটা বানাইসি (Dasein)। আমার উদ্দেশ্য দেখানো যে সন্ত্রাস বিরোধী অনন্ত যুদ্ধের জাহেলী হাসিনা রেজিমে এতদিন আমাদের Dasein এর সম্ভাবনা ছিলো না, আমরা অথেন্টিকেলি থাকতে পারতাম না, আমাদের সত্য অস্তিত্বের বদলে থাকতে হইসে দাস হইয়া, এক ধরণের নিয়মকারী আইনের মধ্যে, একটা ভয়ংকর ডিসকার্সিভ লিমিটের মধ্যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জঘন্য সেক্যুলার কালচারের পায়খানার মেশিনে।

জুলাই ২০২৪  দুইটা লাইনের মাঝখানে আটকা। প্রথম লাইন: "আমি কে, তুমি কে? রাজাকার রাজাকার"। দ্বিতীয় লাইন: "কে বলেছে, কে বলেছে?, স্বৈরাচার স্বৈরাচার"। প্রথম লাইন যদি হয় একটা জোড়ালো এসারশান, আপোষহীন ঐতিহাসিক বিবৃতি, অথবা ইতিহাসের নিজেরই নিজেকে আয়নাঘরের বাইরে আনার প্রক্রিয়া, সেক্যুলার লাশতান্ত্রিক এপারেটাসের শত্রুর প্রতিশোধ, কাফের বাপের বিরুদ্ধে মুমিন পোলার বিদ্রোহ, তাইলে দ্বিতীয় লাইন হইলো সেই কাফের বাপের ভাড়াকরা থেরাপিস্টের ভাষা, পোলারে লাইনে আনার সুপরিকল্পিত প্রোগ্রাম। ২৪ — ইতিহাসের উর্ধে যাওয়ার প্রবণতা (প্রথম লাইন), আর ৭১ (এবং শাহবাগ) — নিফাকী ইতিহাসের একরোখা পুনর্বাসন (দ্বিতীয় লাইন)।   

বাস্তবে এইটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে প্রথম লাইন একটা স্বতন্ত্র শ্লোগান হিসাবেই অনেক ছাত্রর মুখে মুখে দেশের মাটি কাপাইসিলো, ফিরাউনের পাছায় প্রথম আগুন জ্বালাইসিলো। এইটার লজিস্টিক্যাল, অপারেশনাল এবং ইডিওলজিক্যাল ভিত্তি আনডেনিয়াবল ধারালো সত্য। সেই ইতিহাসের আর্কাইভ দেশের মানুষের মনে, বুকে, ঈমানে অন্তর্নিহিত। আমরা সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য এর এম্পিরিক্যাল এভিডেন্স যোগার করার কাজে অনেকেই ব্যস্ত। সোশ্যাল সাইন্টিফিক ডাটা হিসাবে ইতিহাসের সামনে হাজির করানো হবে এই আর্কাইভ, এই পাউডার কেগ (powder keg মানে গানপাউডারের ব্যারেল)। প্রথম লাইনের বাস্তবতাকে অস্বীকার যেহেতু করা যায় না, তাই গুড সেক্যুলাররা[5] বিশ্রী কাউয়ার মতো চোখ বন্ধ কইরা থাকে আর নিজেরে কয় এই বাস্তবতা সত্যি না। এই চোখ বন্ধ করার দুইটা দিক আসে। একটু বেসিক সাইকোএনালিসিসের সাহায্য নিয়া কই: গুড সেক্যুলার প্রথমে চোখ বন্ধ করে কারণ "রাজাকার, রাজাকার" বইলা রাজনৈতিক দাবী করা এবং আইডেন্টিটি প্রকাশ করা গুড সেক্যুলারের জন্য একটা অসম্ভব দাবী, অসম্ভব আটারেন্স। রাজাকার তো হওয়ার কথা ফান্ডামেন্টাল এনেমি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক সেন্সে না, অস্তিত্বের প্রশ্নেও। তাই যখন দেশের মাটি কাইপা উঠে "আমি কে, তুমি কে? রাজাকার রাজাকার" এই স্লোগানে, তখন এই বাস্তবতা একটা ভয়ংকর দুস্বপ্নর রিয়ালিটি পেনেট্রেট করার কংক্রিট এভিডেন্স আকারে হাজির হয়। গুড সেক্যুলারের প্রথম চোখ বন্ধ করার কারণ এইটা। কিন্তু, দ্বিতীয় আরেকটা আরো সুক্ষ কারণ আসে। "রাজাকার, রাজাকার" এই স্লোগান যখন একটা কোরাসে পরিণত হয় এইটা বহির্ভূত অন্যের (other) রাজনৈতিক স্লোগান থাকে না। এই কোরাস প্রশ্নবিদ্ধ করে গুড সেক্যুলারের নিজের আইডেন্টিটির ভিত্তিকে। তার নিজের মধ্যেই কি রাজাকারের ইতিহাস, একটা লুকানো পরিচয় হিসাবে, একটা সুপ্ত বাসনা হিসাবে অন্তর্নিহিত? এই রাজাকার শুধু বাইরের জিনিস থাকে না। রাজাকার গুড সেক্যুলারের গঠনের ভিতর একটা সুপ্ত, লুকানো এলিমেন্ট হিসাবে আস্তে আস্তে ভাইরাসের মতো আরো জোড়ালো ভাবে হাজির হইতে থাকে, বড় হইতে থাকে। গুড সেক্যুলার একটা প্যারানয়ার মধ্যে ভুগা শুরু করে। এক ধরণের জ্বর আসার মতো ফিলিংস হয়।   

ক্যারিবিয়ান মনোবিশ্লেষক এবং বিপ্লবী ফ্রান্জ ফানোঁ[6] — যারে আলজেরিয়ান ইসলামীরা আদর কইরা কমরেড ইব্রাহিম ওমর ফানোঁ ডাকতো — সাদা মাইনষের বর্ণবাদী চিন্তাভাবনা এবং আত্ম-গঠন বিশ্লেষণ করতে গিয়া বুঝসইসিলেন যে ইউরোপীয়ানদের বর্ণবাদী স্ট্রাকচারের মধ্যে শুধু মাত্র অন্যকে ঘৃণা করা বিষয়টা সেন্ট্রাল না। সাদা মানুষের ঘৃণার তলে নিজের উপর প্যারানয়া বিদ্যমান, সে দুঃস্বপ্ন দেইখা ঘুম থিকা লাফ দিয়া উঠে, "আই হায় সে যদি নিজেই কালো হয়?!" Unconscious এর মধ্যেই আত্ম-ঘৃণা। উইঠা আয়নায় তাকায়া দেখে সে এখনো সাদা। কিন্তু তড়িঘড়ি কইরা সে তার কনশাস লাইফের সব কিছুকে প্রাইভেট প্রপার্টির মতো রক্ষা করতে চায়। তার পরিবারকে সাদা পাড়ায় রাখে। কালোদের ghetto তে সীমাবদ্ধ রাখে। মাঝেমাঝে কালোদের পাবলিক লিনচিং করে। যদি কোনো রকমের গুজব শোনা যায় যে অমুক সাদা মাইয়া তমুক কালো পোলার লগে শুইসে, তখন সেই ক্রীতদাসকে লিনচিং কইরা ক্যাস্ট্রেশন করে সাদা গুন্ডাপান্ডারা। এইটা শুধু পলিটিকাল পাওয়ার দেখানো না, বা সাধারণ রেসিজম না —এইটা কর্পোরিয়াল (corporeal) স্তরে নিজেকে মানুষ (read: white) হিসাবে জারি রাখা স্লেভের (represented as anti-human) বিপরীতে। ফানোঁর এই রেডিক্যাল ইন্টারপ্রিটেশন দিসেন আফ্রো-পেসিমিজম নামের একটা নতুন তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ফ্রাঙ্ক উইল্ডার্সন[7]। আমার জিগরী দোস্ত ব্ল্যাক এনার্কিস্ট-টার্ন্ড-ইসলামিস্ট হেনিবল শাকুর তার ভাতিজার মতো। ফ্রাঙ্ক আমাদেরকে শুধু একাডেমিক ভাবে শিখায় নাই। আমেরিকার সাম্প্রতিক পুলিশি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে riot এবং আমেরিকার ওয়েস্ট কোস্টের কালো পারাগুলাতে সেলুলার লেভেলে যেই পলিটিকাল অর্গানাইজিং হইসে সেইখানে ফ্রাঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ থিওরিটিক্যাল অবদান রাখসেন। UC-Irvineএর মতো একটা suburban সাদা পাড়ার প্রতিষ্ঠানে এই ধরণের কাজ সম্ভব না।আরো বলতে হয় যে ফ্রাঙ্ক তার আগের লাইফে ছিলেন সাউথ আফ্রিকাতে অপার্থেইড-বিরোধী আন্দোলনের সশস্ত্র প্রোপাগান্ডিস্ট, ক্রিস হানির কমরেড। এই ফ্রাঙ্ক উইল্ডারসনই আবার পরের জীবনে ছিলেন এডওয়ার্ড সাঈদের ছাত্র। ফ্রাঙ্ক আমাদের বুঝাইসেন যে একজন শ্রমিক (পুঁজিবাদের মধ্যে), একজন পোস্টকলোনিয়াল সাবজেক্ট (নিওকলোনিয়ালিজমের লজিকের মধ্যে), একজন ইহুদি (এন্টি-সেমিটিজম এর মধ্যে), এমনকি একজন সাবঅল্টার্ন  যেই নিপীড়ন, শোষণ, এবং জুলুমের শিকার হন সেইগুলা স্ট্রাকচারালি হইলো কনফ্লিক্ট, আর কনফ্লিক্টকে এই দুনিয়াতেই রিসোলভ করা যায়। কিন্তু এন্টি-ব্ল্যাকনেস হইলো এক ধরণের এন্টাগোনিজম (কনফ্লিক্ট না) যেইখানে মানুষ নিজেকে আধুনিক ইতিহাসে দাঁড় করায় ক্রীতদাসের কল্লার উপর ভর কইরা। এই এন্টাগোনিজমকে ভাঙতে হইলে যেই এপিস্টেমিক-মেটেরিয়াল এরেঞ্জমেন্ট দুনিয়াকে সংগঠিত করে সেইটারে শেষ করতে হয়। যেই লিবিডিনাল-ইকোনমি (বাসনা আর স্বপ্নের স্ট্রাকচার) মানুষ নামের ক্যাটেগরিকে মানুষিক ভারসাম্য (psychic stability) দেয় সেইটাকে নস্যাৎ করতে হয়।

আমি আফ্রো-পেসিমিস্ট চিন্তা এবং ফানোঁর সাইকোএনালিটিক বিশ্লেষণ এইখানে উঠাইলাম কারণ আধুনিকতায় মানুষের মানুষ হওয়ার প্রসেসে যেমন একটা কর্পোরিয়েল (corporeal) জায়গা আসে, ঠিক তেমনি মানুষের মানুষ হওয়ার মধ্যে একটা সেক্যুলার বাসনাও আসে। মানুষের স্ব-নির্মাণের এই দুই দিক বুঝার জন্য আপনি দুইটা আধুনিক রাষ্ট্রের কথা ভাবতে পারেন। ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই রাষ্ট্রেকে স্ট্রাকচারালি হিস্টোরিসাইজ (historicize) করলে আমরা দেখবার পারি যে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র গঠন এবং অর্থনৈতিক অরিজিনে ক্রীতদাস-নির্মাণ ছিলো মৌলিক কাম যেইখানে আইনি ভাবে তাদের সংবিধানের মধ্যেই দাসকে তারা মানুষের ৩/৫ অংশ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করসেন, আর ফ্রান্স তাদের লাইসিটি সেক্যুলারিজম (laicite secularism) কায়েম করার জন্য ধর্মের পাবলিক ব্যবহার বেআইনি ঘোষণা করসেন। যদিও ফ্রান্সের জন্য এই ধর্ম ক্যাটাগরি টেকনিক্যালি সব ধর্মর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আমরা জানি যে পশ্চিমা খ্রিষ্টান এপিস্টেমলজি সেইন্ট পলের হাত ধইরা সেক্যুলার হইতে শেষমেষ দ্বিধাবোধ করে নাই। তাই বর্তমানে ফরাসি সেক্যুলারিজমের সাথে আসল যুদ্ধ করতাসে ইসলাম। ইসলাম ঘরে বইসা থাকে না। আর শরিয়া আইন শুধুমাত্র আপনে হাইগা কেমনে ছুঁচবেন সেই আইন না। কি ধরণের রাষ্ট্র চান, পাবলিক লাইফে আপনে কেমনে থাকবেন, ইসলামকে ধারণ করবেন, এই সবকিছুর সাথে ধর্মের ফাউন্ডিং টেক্সটের সম্পর্ক বিদ্যমান। ফরাসি রাষ্ট্র আপনার কম্প্রিহেনসিভ শরিয়াকে হালাল স্যান্ডউইচ আর ছুঁচার টেকনিকে রিডিউস করসে। ফিউডাল থিকা বুর্জুয়া রাষ্ট্র বানাইতে গিয়া যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্র বানাইতে হয় অথবা ফ্রান্সের মতো সংবিধান রচনা করতে হয় তাইলে চিন্তাশীলতার আর কি প্রয়োজন? শুভ্রত রায় চৌধুরীদের[8] দিয়া সেক্যুলার নর্মেটিভ গঠনতন্ত্রের ভিত্তি বানায়া কামাল হোসেনদের দিয়া কপি-পেস্ট কপি-পেস্ট কইরা দিলেই এনাফ। তাই না?                                       

উইল্ডার্সন আর ফানোঁর বিশ্লেষনে আমরা আরো দেখি যে আধুনিক ফোবিয়া আর প্যারানয়ার সাথে পুঁজিতন্ত্রেরও একটা সম্পর্ক আসে। ইসলামের ব্যাপক সিস্টেমকে মোল্লাতন্ত্র হিসাবে রিডিউস কইরা এর রাষ্ট্রচিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা আসলে পেটি বুর্জুয়ার ফিউডাল অতীতের প্রতি ক্যাপিটালিস্ট ফোবিয়া।  ইসলামিক কর্তাসত্ত্বাকে — রাজাকার হোক, মোল্লা হোক , জঙ্গি হিসাবে রিপ্রেসেন্টেড হোক — ধরা হয় ফিউডাল অতীতের আইডেন্টিটি আকারে। গুড সেক্যুলার আর এক্স-ইসলামিরা এই ফিউডাল অতীতকে অতিক্রম করতে চায় ইসলামিক আইডেন্টিটিকে অস্বীকার কইরা। আহ, আধুনিক সেক্যুলারিজমের কি সিডাকশন! চুম্বকের মতো সেক্যুলারদের কইলজা টানে। উইল্ডার্সনিয়ান জায়গা থিকা এইটা প্রমান করা খুব কঠিন না যে আমরা যখন কোনো ক্রিটিক ছাড়াই নর্মেটিভ ডক্ট্রিন আকারে সাম্য, মানবিক মর্যাদা , সামাজিক ন্যায়বিচার মাইনা নেই, তখন আমাদের ইডিওলজির তলে খুব এক্টিভ ভাবে হাজির একটা বর্ণবাদী ফ্যান্টাসি, সাদা হবার বাসনা, কারণ উদারপন্থী মানুষ হবার বাসনা আধুনিকার ভিতর সাদা হবারই বাসনা। কেমনে হইবেন মানুষ, কেমনে হইবেন সাদা? উত্তর: সেক্যুলারিজম। ফানোঁ এই কিসিমের মানুষিকতা বুঝানোর জন্য একটা টার্ম ব্যবহার করসিলো — "hallucinatory whitening"[9]। এই ফ্যান্টাসি থিকা মুক্ত হইতে হইলে আমাদের দরকার রাজনৈতিক আনকনশাসের (political unconscious) মধ্যে বিপ্লব এবং মৌলিক অন্টোলজিক্যাল পরিবর্তন।                                 

জুলাই আন্দোলন হেটেরোজেনাস (heterogenous) ছিলো কোনো সন্দেহ নাই।এই হেটেরোজেনিটি অবশ্য সব কথার শেষ না। সবাই মিলা মিশা শাহবাগীদের মতো ঘষাঘষি আর বিরিয়ানি খাওয়া আন্দোলন এইটা ছিলো না। এই আন্দোলনের coordinates আর নোডাল পয়েন্টস এর ব্যাপার শেপার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বুঝা। প্রত্যেকটা ভূমিকম্পর কয়েকটা এপিসেন্টার থাকে। জুলাইয়ের ব্যাপারটাও সেইরকম। ইসলামি এবং প্রাক্তন-ইসলামিরা ক্রিটিকাল রোল প্লে করসে। তার মানে নন-ইসলামিরা বাল ছিড়সে তও না। কিন্তু, কারা অগ্রবর্তী যোদ্ধা ছিলো এবং তাদের ইডিওলোজিক্যাল ওরিয়েন্টেশন কি ছিলো, তাদের প্রাকটিক্যাল পলিটিক্যাল প্রসেস কি ছিলো এইটা বুঝতে হইলে ক্যামেরার পিছে যাইতে হবে, খবর রাখতে হবে। ক্যামেরার সামনের পোলাপানরাও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু mass লেভেলে রাস্তা গরম রাখা আর স্ট্রাটেজিক জায়গাতে জায়গাতে গেরিলা স্টাইলে ইন্টারভেন কইরা লীগের আর জাহিলি হাসিনার পুলিশ ফোর্স, সিকিউরিটি পার্সোনালদের কোনঠাসা করা, শায়েস্তা করা দুইডা দুই জিনিষ। জুলাইয়ের আগেও জাহিলী যুগে বেশ কয়েকবার mass আন্দোলন আমরা দেখসি। শেষ পর্যন্ত, কৌশলগত সহিংসতা না থাকার কারণে ওই আগের মুভমেন্টগুলা লাশতান্ত্রিক রেজিমকে উৎখাত করতে পারে নাই। ব্যাপারটা আবার লাশের ক্যালকুলেশনও না। শাপলাতে লাশের সংখ্যা কম ছিলো না। মোদিবিরোধী আন্দোলনেও লাশ পরসে। আমি শাপলা ম্যাসাকারের উপর যখন এথনোগ্রাফিক কাজ করতেসিলাম তখন আমাকে একজন দেওবান্দ আলেম ক্রিটিক্যালি বলসিলো: "শিবিরের ভাইরা ওইদিন শাপলাতে আমরা এই ভাবে RAB আর পুলিশের গুলি খাইলাম, উনারা তো জানে এইসব অবস্থায় কি করতে হয়, কিছু করলো না কেন?" যদিও এই হুজুরের মন্তব্য ফ্রাগমেন্টেড একটা অভিমত তবুও এই রকম হতাশাপূর্ণ ভাবনা আমি অনেক আলেমদের মধ্যে দেখসি। এইটা ঠিক পলিটিকাল ক্রিটিসিজম না, এক ধরণের দুঃখ প্রকাশ, সংহতি খোঁজা। আমরা এইটাও জানি যে শিবির শাপলাতে হাজির ছিলো। সুতরাং তাদেরকে ব্লেম করার কিছু নাই। আমি হুজুরের এই মন্তব্যটা শেয়ার করলাম দেখানোর জন্য কেন স্ট্রাটেজিক সহিংসতা কিছু সিচুয়েশনে আবশ্যক হইয়া দাঁড়ায়। জুলাইতে দেশের নানা ক্যাম্পাসে এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটিতেও বিশেষ কয়েকটা জায়গাতে শিবিরের ইন্টারভেনশন ছিলো মাইন্ড-ব্লোইং। শিবিরের ওই ভূমিকাটা ছিলো অগ্রবর্তী চক্রের মতো। এইটা আবার প্রথাগত বামদের ভ্যানগার্ড-গিরি না। অগ্রবর্তী চক্র কোনো একটা সেন্ট্রালাইজড নেতৃত্বে চলে না। একেকটা শিবির একেকটা নিজস্ব স্টাইলে চলে, এবং একটা ছড়ানো নেটওয়ার্কের মধ্যে এরা পলিটিকাল ইন্টারভেনশন করে। এরা শুধু রাজনৈতিক মিটিং মিছিল করে না। একটা মোড অফ লাইফের মধ্যে থাকে যেইটা আমাদের সেক্যুলার জাহিলী যুগে রাজনৈতিক রূপ নেয়। আমার এক বড় ভাই আমারে এই মোড অফ লাইফ বুঝাইতে গিয়া বললেন: "শিবিরের গ্রামের এলাকাগুলাতে ওরা কেমনে থাকে, কাজ করে সেইটা বুঝতে হবে। সাধারণ এই ছেলেরা চিন্তা করে না "আমি কি হবো" এরা ভাবে "আমি কি দিবো" ইসলামের জন্য। হামাসের কর্মীদের দেখসেন না? এরা আল্লাহর কাসে দুআ করে যাতে তাদের জান দাওয়ার মধ্য দিয়া ইসলামের ভিক্টোরি হয়।" তাদের মোড অফ লাইফ বুঝাইতে এই বড় ভাই বুঝাইলেন কিভাবে শীতকালে গ্রামে যখন সব কুয়াশায় ঢাকা, সামনের কিচ্ছু দেখা যাইতাসেনা, এইরকম অবস্থায় ফজরের সময় একজন শিবির পুরান সাইকেল চালায়া নতুন সাথীদের দরজায় গিয়া গিয়া নক কইরা উঠায়, কারণ সাথীদের নামাজ কাজা হওয়া যাবে না শিবির হইতে হইলে। এই হইলো মোড অফ লাইফ। অবশ্যই তারা নিজেদের ইসলামের নর্মেটিভ ট্রেডিশনের মধ্যে পায়, কিন্তু এই ট্রেডিশনের ফাউন্ডিং টেক্সটগুলার মধ্যে যা লিখা আসে তা ইসলামিদের জীবন ব্যবস্থার মধ্যে রূপ নেয় এই ধরণের সাধারণ উদ্দীপনার একটিভিটির মাধ্যমে।

ইসলামি প্রেক্ষাপটে আমাদের মোড অফ লাইফের পাশাপাশি আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক জায়গা বুঝা প্রয়োজন: সেইটা হইলো de-subjectification। একজন সাবজেক্ট সাবজেক্ট হয় কারণ সে সবসময় সুবজেক্টেড টু সামথিং। সেক্যুলার জাহেলিয়াতে আপনি যখন সাবজেক্ট, আপনে সুবজেক্টেড টু সেই জাহিলিয়ার নিয়ম, কায়দা, তরিকা, ডিসকোর্স, সামাজিক নর্মসে। একজন ইসলামি তার নিজস্ব ট্রেডিশনকে পায় কন্ট্রাডিকশন আকারে এই সেক্যুলার জগতে। তাই সাবজেক্ট হিসাবে একজন ইসলামি আয়নাঘরে যাওয়ার আগেই আয়নাঘরে বাস করে! তাই একদম সাধারণ প্রতিদিনের জীবনযাপনে সে একটা পলিটিসাইজড সাবজেক্ট। পলিটিসাইজড খুব মৌলিক জায়গায়: সে সাবজেক্ট কিন্তু আবার ক্রমাগত ভাবে ডি-সুবজেক্টিফিকেশনের মধ্যে থাকে, সেক্যুলারিটিকে প্রত্যাখ্যান করে। সে সাবজেক্ট, আবার সে তথাকথিত সাবজেক্ট না। একজন মুসলিম যখন ঘুমের ঘোরে থাকে সে তখন বুঝতে পারে না সে যে আসলে আয়নাঘরে না থাইকাও আয়নাঘরে আসে। এই ঘুমের নাম মিস্টিফিকেশন। একজন ইসলামিস্ট তার এই কন্ডিশনের ব্যাপারে এককারে কিলিয়ার — মিস্টিফাইড না। আর, যারা ঝানু ইসলামি তারা শুধু এই কন্ডিশন জাইনা বইসা থাকে না। তারা দীর্ঘ একটা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং কাজ আগায়া নেয়। মুসলিম, এক ধাপ আগায়া ইসলামিস্ট, আরো এক ধাপ আগায়া কনশাস রাজাকার — বাঘের বাচ্চা!            

এপিলগের বাকি অংশে আমি এই সংকলনের কয়েকটা সিলেক্টেড আর্টিকেল ক্রিটিক্যালি রিভিউ কইরা আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা শেয়ার করুম। প্রবন্ধগুলা সোজাসোজি ভাবে না পইড়া, তলের নানা অনুমান এবং ক্যাটাগরি নিয়া দুই চারটা কথা কমু। আমি এই লিখকদের কিছু পয়েন্টস মাঝেমাঝে ভিন্ন দিকে নিয়া নতুন ভাবনা নির্মাণ করুম, জুলাইয়ের স্পিরিটের রাজনৈতিকতা আরো মজবুত করার জন্য। সংকলনের সব কান্ট্রিবিউটরদের শুকরিয়া। ইনশাল্লাহ, আমার পর্যবেক্ষন, ক্রিটিক, নতুন চিন্তা লিখকদের আরো ভাবাবেন।  

তাহমিদাল জামি তার লিখাতে "ইনসাফ" এবং "বান্দা" এই দুই ক্যাটেগরিকে ডি-থিওলজিইজিশন কইরা ইসলামিক অর্থোডক্সি অথবা ইসলামিক নর্মেটিভ জায়গা থিকা উদ্ধার করতে চাইসেন। দেখাইতে চাইসেন এই বান্দা ওই বান্দা না, এই ইনসাফ ওই ইনসাফ না। এই বান্দা শেষমেষ আল্লাহর বান্দা না হইয়া জীবন-মুখি দুনিয়াকেন্দ্রিক মানুষ হইতে চান, এই বান্দার বাসনা "ইউনিভার্সাল" রাষ্ট্রে নাগরিক হওয়া। ফিউডাল থিকা বুর্জুয়া রাষ্ট্র, অর্থাৎ  দিনশেষে লিবারেল রাষ্ট্র। কেউ সেক্যুলার উদারপন্থী হইতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু এই কথাটা সোজা ভাবে না বইলা ঘুরায়া বলার কারণগুলা কি হইতে পারে? জামি সেক্যুলারিজমকে সেক্যুলারিজম হিসাবে না বুঝায়া ইনসাফের মানে বুঝাইসেন। বাঙলার নানা রেফারেন্স দিয়া প্রমান করতে চাইসেন যে ইনসাফের ভিতরকার বৈশিষ্ট হইলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার। অথচ এইটা একদম সেক্যুলারিজমের মৌলিক সংজ্ঞা। অবশ্য একটা জব্বর মুভ করসেন জামি: হবস (Hobbes) আর স্মিটরে (Schmitt) পাশ কাটাইয়া আগামবেনের (Agamben) কান্দে উইঠা আর বাতাইয়ের (Bataille) কোলে উইঠা কইসেন এই রাষ্ট্র শুধু কন্ট্রাক্ট না, শুধু শত্রু-বন্ধু'র একে ওপরের উপর হামলা না। জামি বলসেন যে "অভিপ্রায়" বেশি আইনি ও আনুষ্ঠানিক, তাই বাসনার উপর ফোকাস করা জরুরী। আমি একমত, বাসনার উপর নজর দাওয়া ভালো। কিন্তু, এইখানে কয়েকটা প্রশ্ন আমি করতে চাই, ঠিক জামির উদ্দেশে না, কিন্তু তার লিখাকে উসিলা কইরা জেনেরালি জিগাইতে চাই: বাসনা কোনখান থিকা আসে? বাসনার স্ট্রাকচার কি? যারা আনুষ্ঠানিক ভাবে মুসলিম, মানে যারা একতারা দিয়া টুং টাং করে আর কইয়া বেড়ায় "নামাজ আমার হইলো না আদায়, কিন্তু আমি তবুও মুছলমান" তাদের বাসনার কন্ডিশনটা আসলে কিরকম? যারা অর্থোডক্সিরে জাতিবাদ ইসলাম কইয়া গাইল পারে তাদের বাসনার উৎস কি (জামি এইটা করে নাই, কিন্তু অন্যান্যরা করে)? এইগুলা রেটোরিক্যাল প্রশ্ন না। আমাদের আসলে দায়িত্ব হইয়া দাড়াইসে সেক্যুলার কর্তাসত্তার নানা ভাব ভঙ্গি, ধরণ, ধারা বুঝতে পারা। সেক্যুলারিটিকে অনেকে সেক্যুলারিজম থিকা আলাদা কইরা দেখতে চায়। এই পৃথকীকরণ কইরা বুঝাইতে চায় যে সেক্যুলারিজম একটা ডকট্রিন কিন্তু সেকুলারিটি একটা সম্ভাবনা। মানে সেকুলারিটি সেক্যুলারিজমকে আবার উন্মোচন কইরা, এক্সপেরিমেন্ট কইরা, পরীক্ষা নিরীক্ষা কইরা নতুন ভাবে হাজির করবার চায়। সেক্যুলারিটির কি সেই capaciousness আসে? কয়েকশো বছরের সেক্যুলার ইতিহাসের ধ্বংসলীলা কি নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা, নতুন শব্দ আর ভাষার হের্মেনুটিকস দিয়া পুনর্বাসন করা যাবে?                                  

মুসা আল হাফিজ আবার অন্য আরেকটা জায়গা থিকা ইসলাম এবং (সেক্যুলার) ইনসাফের সামঞ্জস্যপূর্ণতাকে ধরতে চাইসেন। আল হাফিজ দেখাইসেন কিভাবে বাঙলার জেনিওলজিতে বাঙালি মুসলিমকে অপরায়ণ (otherize) করা হইসে বাঙালি হিন্দুর বিপরীতে। আল-হাফিজ বলতেসেন এইটা কলোনিয়াল কন্সট্রাকশন। এই কন্সট্রাকশনের সাহিত্যিক ইতিহাস আল-হাফিজ তুইলা ধরসেন। তারপর উনি মুসলিমদের আইডেন্টিটির মধ্যে এক ধরণের নমনীয়তার ইতিহাসের কথাও বলসেন, মাশাল্লাহ। আধুনিকতার পূর্বের সময়ে বাঙালি মুসলিমদের সাথে সমাজের অন্যান্যদের সহযোগিতার ইতিহাস স্পষ্টভাবে উপস্থিত। এই প্রিকলোনিয়াল নস্টালজিয়া, অতীতের প্রতি এই আকুলতা আমাদের জুলাইয়ের পর কই নিতে পারে? প্রাক-ঔপনিবেশিক সহযোগিতা কি আধুনিক লিবারেল ইকুয়ালিটির (আধুনিক সেক্যুলারিজম) মধ্যে পাঠযোগ্য হবে? জুলাইয়ের পর যখন আমরা পিছের দিকে তাকাই, এই রেট্রোস্পেক্টিভ ইতিহাসের ভাবনা কি এক ধরণের মিথো-পোয়েটিক (mythopoetic) রূপ নেয়? আল-হাফিজের ইতিহাস পাঠ যদিও কালানুক্রমিক, এই ইতিহাসের পথকে বর্তমানে খুইজা পাইতে হইলে ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের ভাষায় বলতে হয় ইতিহাসের ইমার্জেন্সি-ব্রেকে টান মারা ছাড়া উপায় নাই। সময়ের রাস্তার সাথে ইতিহাসের ফ্রিকশন তৈরী কইরা ইতিহাসকে ইতিহাসের কবল থিকা মুক্ত করা আমাদের জিহাদি দায়িত্ব। মিথো-পোয়েটিকস, অরিজিন খুইজা  পুরানকালরে পূজা কইরা, সেক্যুলার প্রগ্রেসের জন্য সিভিলাইজেশনাল ও সাংস্কৃতিক রিসোর্স আকারে হাজির হয়। কিন্তু মিথো-পোয়েটিকসকে poesis বানাইতে হইলে সেক্যুলার প্রগ্রেস আমাদের গন্তব্য হইতে পারে না। সেক্যুলারিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ কইরা সৃষ্টিশীল ঠিকানার দিকে আগাইতে হইলে বাঙালি মুসলমানের আসলেই বাঙালিপনা ছাইড়া মুসলমানের বাচ্চা হইতে হবে — জাতিবাদী সেন্সে না কিন্তু রাজনৈতিক ও এথিকো-লিগ্যাল সেন্সে। শরিয়াকে শুধুমাত্র পসিটিভ ল'এর জায়গা থিকা না বুইঝা অন্টোলজিক্যাল ভাবে উপলব্ধি করতে হবে। ওই অন্টোলজিক্যাল বোঝাপড়ার আবির্ভাবের মাধ্যমেই আমাদের স্পিরিট এক চূড়ান্ত পয়েন্টে পৌছবে। এই পয়েন্টই (ইসলাম-বান্ধব) রাষ্ট্র।

মুসা আল হাফিজের মতো শিহান বিন ওমর ও বাঙালি-মুসলিমের সিভিলাইজেশনাল জিনিওলজিকে মূল্য দিসেন। বিন ওমর অন্টোলজিক্যাল প্রশ্ন তুলেন নাই, কিন্তু ইনসাফের সেক্যুলারিটিকে গন্তব্য হিসাবে মানেন নাই। বিন ওমর সজোরে বলসেন ইসলামি নর্মেটিভ ট্রেডিশনের কথা। মোঘল বা ওসমানী শাসনব্যবস্থা নিয়া খাজুইররা পেচাল না পাইরা বিন ওমর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামিদের দার্শনিক ভিত্তির রাজনৈতিকতা নিয়া বলসেন। বিন ওমর লিখসেন: "ইসলামপন্থীরা কেবলমাত্র অতীত ইতিহাসের বিভিন্ন নমুনার অন্ধ অনুকরণ (imitate) করার পক্ষপাতী না। উদাহরণস্বরূপ ইসলামপন্থীরা কেবলমাত্র মোঘল কিংবা ওসমানী শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালায় না।... ইসলামপন্থীরা নিজেদের আন্দোলনকে আদর্শিক বা মূল্যবোধগত (normative) আন্দোলন হিসেবে দেখে। সেই অর্থে তাদের আদর্শ বা মূল্যবোধের (normativity) শাস্ত্রীয় উৎস হচ্ছে কোরআন ও সুন্নাহ এবং ঐতিহাসিক উৎস নববী ও খোলাফায়ে রাশেদীনের (প্রথম চার খলিফার) শাসনামল।" আল হাফিজের লিখা পইড়া আমার মনে হইসিলো যে বাঙালি-মুসলিম আইডেন্টিটির ইসলামি রাজনৈতিক এবং এথিকো-লিগ্যাল জায়েগাতে জোর দাওয়া দরকার। ঠিক এই কামটাই বিন ওমরের লিখায় লক্ষণীয়। এনথ্রোপলোজিস্ট তালাল আসাদের ১৯৮৬ সালের গ্রউন্ডব্ৰেকিং লিখা "The Idea of an Anthropology of Islam"[10] এইখানে প্রাসঙ্গিক। আসাদের মতো বিন ওমর ফাউন্ডিং টেক্সট (কুরআন, হাদিস, শরিয়া), ডিসকার্সিভ ঐতিহ্য, এবং ক্ষমতার মেকানিজম আকারে অর্থোডক্সিকে গুরুত্ব দিসেন। বাঙালি-মুসলিমের বাঙালিপনাকে ফেটিশের বস্তু আকারে  (fetish object) ইন্টারপ্রেট না করতে হইলে অবশ্যই বারবার ঈমানি জায়গা রিনিউ করতে হবে। নিজের ইসলামি হেরিটেজকে তার জাতিগত পরিচয়ে এসেনশিয়ালাইজ না কইরা ইসলামের অসীম সম্ভাবনাকে খোলা রাখতে হইলে এই কাজের কোনো বিকল্প নাই।                 

আব্দুর রহমান বারী তার কান্ট্রিবিউশনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের লাশতান্ত্রিক বাসনা বুঝানোর জন্য আহমেদ ছফার অলাতচক্র উপন্যাসের রেজোয়ান চরিত্রের আত্মহত্যা এবং তার চিরকুটে লিখা জাস্টিফিকেশনের উদ্ধৃতি দিসেন। বড় আপা পাকিস্তানি মেজরকে বিয়া করসে শুইনা রেজোয়ানের মাথায় আগুন লাইগা যায়। সে তার বোন আর বোনের মেজর জামাইরে খুন করতে চায়। কিন্তু রেজোয়ান ভারতে থাকে বইলা প্রতিশোধ নিতে পারে না। মাইনা নিতে না পাইরা সে ঘুমের ওষুধ খাইয়া ওভারডোজ হইয়া মইরা যায়। উপন্যাসের এই গল্প ক্লোস রিডিং কইরা বারী দেখাইসে যে বাঙালি জাতিবাদের একদম গোড়ায়, ৭১ এই লাশতন্ত্রের বাসনা। বারী তারপর যুক্তি দিসেন যে জুলাইকে ৭১ এর লেন্স দিয়া দেখলে এইটা হবে ২৪ এর প্রতি এক ধরণের এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স। আমি বারীর সাথে একমত। কিন্তু এই গল্পের সাইকিক ডাইমেনশনটা নিয়া আমি আরেকটু ভাবতে চাই। ছফার ন্যারাটিভে তিনটা প্রধান চরিত্র: বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় মগ্ন রেজোয়ান, দুশমনের চরিত্রে পাকিস্তানি মেজর, আর রেজোয়ানের বড় আপা (রাজাকার)। রেজোয়ানের নোটে সে খুব স্পেসিফিক কথা কইসেন। সে ডিসপ্যাশনেট ভাবে কইতে পারতো যে তার বড় আপার সাথে তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য আসে। রেজোয়ান তা কয় নাই। বরং রেজোয়ান একটা অসুস্থ ম্যানিয়াক — একটা সিক ফাকের মতো ক্ষিপ্ত! এই ক্ষিপ্ততার স্ট্রাকচার — সাইকো-সেক্সুয়াল। বড় আপা কেমনে খুশি হইয়া পাকিস্তানি মেজরের "সঙ্গে একই বিছানায়" ঘুমায়? মনোবিশ্লেষণের জায়গা থিকা  বলা যায় রেজোয়ানের মধ্যে একটা সেক্সুয়াল টেনশন কাম করে। এই সেক্সুয়াল টেনশন আবার প্রথাগত পুরুষতন্ত্রে মাইয়ার উপর বাপের কন্ট্রোল না। ছোট ভাইয়ের বড় বোনের উপর ক্ষোভ। পাকিস্তানি মেজরের সামনে রেজোয়ানের ক্ষুদ্রতা। শুধু রাজনৈতিক ক্ষুদ্রতা না, এক ধরণের পুরুষত্বহীনতা। মনোবিশ্লেষক ও চিন্তক জুলিয়েট ম্যাক্যানেল[11] কালেক্টিভ আনকন্সাস নিয়া বলসেন যে পুরাণ সভরেইনের পুরুষতন্ত্রের আবির্ভাব ঘইটা আধুনিক মডেলে নতুন চরিত্রর আগমন হইসে। বাপের মৃত্যু হইসে, কিন্তু ভাই আইসা ঢুকসে। ম্যাক্যানেল বলসেন গণতন্ত্রের নতুন সিস্টেমে আমাদের সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশন বুঝতে হইলে পরিবারের ছবি নতুন কইরা আকঁতে হবে। ম্যাক্যানেল কইসেন: “To complete the portrait of what is now an artificial group in modern life, we have to put not the Father but the Brother at the centre” (ম্যাক্যানেল, ১৯৯১)। সুপার-এগোর সেক্যুলার আধুনিকায়নের প্রক্রিয়ায় এই ভাইয়ের ভূমিকা সিরিয়াস। এইসবের সাথে সেক্যুলার লাশতন্ত্রের কি সম্পর্ক? ক্যামেরুনের চিন্তাবিদ আকিলি এমবেমবে[12] লাশতন্ত্রের যেই তত্ত্ব দিসেন এইটাতে উনি বুঝাইসেন কেমনে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজে দুর্নীতিবাজ রেজিম মৃত্যুকে বিতরণ এবং পরিবেশন করেন। মাঝেমাঝে গুলি কইরা মারেন, মাঝেমাঝে উধাও কইরা দেন, মাঝেমাঝে মাইরা প্রদর্শন করেন। আমি এই লাশতন্ত্রের সামনে সেক্যুলার শব্দটা বসাই শুধুমাত্র একটা বিশেষণ আকারে না। সেক্যুলার শব্দটা লাশতন্ত্রকে ইসলামি দুনিয়াতে এক ধরণের স্পেসিফিসিটি দেয় যেইটা বুঝা জরুরি। ম্যাক্যানেল বাপের সুপার-ইগো পজিশনে ভাইরে ঢুকায়া দেখাইসেন যে আধুনিকায়নে আগের সভরেইন যেইভাবে জুলুমবাজি করতো, সেইটার রূপ এখন বদল হইসে। এখন এক ধরণের একুয়ালিটির ফ্যান্টাসি বিদ্যমান, যেইখানে নতুন শাসক-ব্যবস্থার আকার এবং রূপ শাসকের মতো না। ভাই তার বোনকে বাপের মতো শাসন করে না, আবার করেও। ভাই আর বোন সম্পর্কে এক ধরণের সাম্য দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু এই ভাই এক দিক দিয়া ভাই আবার আরেক দিক দিয়া বাপ। ছফার গল্পের রেজোয়ানের সাইকো-পলিটিকাল রোল হইলো ৭১ এর সেক্যুলার বাসনাকে রক্ষা করা। রেজোয়ানের চরিত্রের মধ্যে লুকানো আসে তার বোনের প্রতি অজাচারী বাসনা যেইটা সে অস্বীকার করে এবং ভুইলা থাকতে চায়। কিন্তু পাকিস্তানী মেজরের স্বামী হিসাবে উপস্থিতি তার বড় আপার জীবনে, তাকে তার এই রিপ্রেসেড ডিজাইরকে আর ভুইলা থাকতে দেয় না। এই জন্য সে তাদের খুন করতে চায়। পারে না, তাই আত্মহত্যা করে। এই খুন শুধু রাজনৌতিক না, এইটা সাইকোলজিক্যাল খুন। সেক্যুলার লাশতন্ত্রের অচেতন জগতে একটা অজাচারী বাসনা                                                

তরিকুল হুদা তার প্রবন্ধের শিরোনাম ডিকন্সট্রাক্টিভ স্টাইলে "রাজাকারনামা" লিখসেন। এই "রাজাকার" শব্দকে রাখা, তারপর মুছে ফেলা শুধুমাত্র একজন লিখকের ব্যক্তিগত দার্শনিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ না। হুদা রাজাকার ক্যাটেগরির ঐতিহাসিক আবির্ভাব এবং রাজনৈতিক/স্ট্রাকচারাল নেসেসিটি ৭১ থিকা ২৪ পর্যন্ত কেমনে হইসে সেইটা মূল্যায়ন করসেন। সেক্যুলারিজমের রাজনৈতিক কন্ট্রাডিকশনের একদম মৌলিক সংকটের অন্টোলজিক্যাল বিশ্লেষণ করসেন। সেক্যুলারিটিকে ক্যাপাসিটি হিসাবে না ভাইবা হুদা নন-ইসলামিদের পোস্ট-সেক্যুলার হওয়ার জন্য উৎসাহিত করসেন। সহজ moralist আর সাংস্কৃতিক যুক্তি পাশ কাটায়া হুদা খুব স্পেসিফিক এবং টেকনিকাল সেন্সে হাইডেগেরের "Identity and Difference" ব্যবহার কইরা দেখাইসেন যে সেক্যুলারিজম যেই সব কন্সেপ্টস আইডেন্টিটির উল্টা দিকে খাঁড়া করায়, যেমন সাম্য, নাগরিকত্ব, ইত্যাদি, এই কনসেপ্টসগুলা হেইডেগেরিয়ান অর্থে metaphysics of universalityর উপর নির্ভরশীল। এই ধরণের মেটাফিজিক্যাল চিন্তা আপনার বিশুদ্ধ বসবাসকে ব্যাহত করে। হাইডেগেরের দার্শনিক জীবনের শেষের দিকে উনি ereignis নামের একটা ধারণা নিয়া ভাবা শুরু করসিলেন। হুদা এই বিরল কনসেপ্টকে হাইডেগেরের আর্কাইভ থিকা খুইজা বাইর কইরা জুলাইকে একটা fundamental event আকারে দেখাইলেন। কিন্তু যেই গতিতে জুলাই হইয়া অগাস্ট আসলো, ততো তাড়াতাড়ি লিবারাল পন্ডিতরা আইসা উপস্থিত হইলো। তারা জুলাইকে এক্সক্লুসিভলি নাগরিক অধিকারের জায়গা থিকা ব্যাখ্যা করলো। তারা আন্দোলনকারীদের শুধু মাত্র সাম্যর সৈনিক আকারে ফ্রেম করলো। হুদার ফেনোমেনোলজিক্যাল চিন্তা যদি আমরা সিরিয়াসলি নেই, তাইলে আমরা আরো যত্নশীল হবো, আমরা ভাবার চেষ্টা করবো আমাদের স্বত্তার মৌলিক আবির্ভাবের কথা। জুলাই কি এই জমিনে স্বত্তার উন্মোচনের জন্য নতুন কইরা দাঁড়ানোর আরেকটা সম্ভাবনা? জুলাই কি Ereignis এর মতো এক ধরণের ডাইনামিক প্রক্রিয়া যেইখানে স্বত্বা সত্যের ঠিকানায় বিশুদ্ধ ভাবে বাস করবার শুরু করে, একটা সংকুচীত পরিচয় নিয়া বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করে না? এই দার্শনিক অনুসন্ধানের রাজনৈতিক সমাধান শরিকানা। শরিকানা হইতে হইলে প্রথম কাম — রিকোগনাইজ করা। "আমি কে, তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার" সেন্টেন্স এবং ব্যাকরণের দিক দিয়া খুব পরিষ্কার। নিজেকে প্রশ্ন: আমি কে? ভাই বা বোন কে প্রশ্ন: তুমি কে? উত্তর: রাজাকার, রাজাকার। আত্মউপলব্ধি, অন্যকে স্বীকৃতি। একজন আরেকজনকে স্বীকৃতি। দ্বিতীয় স্লোগান "কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার" এই সেন্টেন্স বুঝাও গুরুত্বপূর্ণ। এরা রাজাকারকে রাজাকার হিসাবে বুঝতে চায় না। রাজাকারকে শুধুমাত্র শেখ হাসিনার গালি হিসাবেই পড়তে জানে। এর কারণ খুব সহজ: তাদের ইতিহাসপাঠের নিয়ম। এরা ৪৭ থিকা ৭১কে দেখে কালানুক্রমিক ভাবে এবং ৭১ কে ফেটিশ করে। যারা বাকশালীদের বিরুদ্ধে "কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার" স্লোগান দিসিলো তারা বাকশালীদের রাজনৈতিক রিপ্রেশনকে চিনতে ভুল করে নাই, কিন্তু বাকশালীদের ধারণাগত দমনমূলক কাঠামোর ব্যাপারে তারা অনিশ্চিত। রাজাকারের বাকশালী সংজ্ঞার বাইরে রাজাকার নিয়া ভাবতে ব্যর্থ। কিন্তু অসুবিধা নাই। এরাও শরিকানার অংশ। এরাও জীবন দিয়া বাকশালের ইমিডিয়েট লাশতান্ত্রিক রেজিমকে শরাইসে। পরের ধাপ হইলো: চিন্তার বাকশালী কাঠামোকে গুড়ায়া দাওয়া। আপাতত, হুদার মতো আমিও কই “রাজাকারনামা”ই ম্যানিফেস্টো। রাজাকার: আছে, নাই, নাই-হিসাবে-আছে, তার থাকা সবসময় একধরণের না থাকা। তার ভুতুড়ে উপস্থিতির কোনো শেষ নাই। সন্ত্রাস বিরোধী অনন্ত যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রধান সৈনিক হইলো এই ভূত। অনেকে ভূতকে ভয় পায়। আমি ভূতের ব্যাপারে খুব কৌতুহলী।

[1] Martin Heidegger, Being and Time, Macquarrie and Robinson (Trans.), Harper & Row Publishers Inc., 2008.

[2] Martin Heidegger,  (1977g). "The End of Philosophy and the Task for Thinking." In D. F. Krell (Trans.), J. Stambaugh (Ed.), Martin Heidegger: Basic Writings. (pp. 369-392), Harper-Collins, 1977.

[3] ২০১০ বা ২০১১র দিকে জার্মান ক্রিটিকাল থিওরি অধ্যাপক গেরহার্ড রিকটারের একটা সেমিনার নিসিলাম UC-Davis এ। সেমিনারটার নাম ছিলো "What is called thinking?" এই নামে হেইডেগেরের একটা গ্রউন্ডব্ৰেকিং লিখা আসে। রিকটারের সাথে নানা দর্শন বিষয় আলোচনায় হুসার্ল আর হেইডেগের সম্পর্ক নিয়া অনেক কথাবার্তা হইসিলো। আমার এই ফিকশনাল গল্পটা ওই আলোচনার উপর ভিত্তি করা।

[4] "দাস-আইন (Dasein)" টাইটেলটার অনুপ্রেরণা এবাদুর রহমানের বই "দাস ক্যাপিটাল" যেইখানে সে মার্কসের "Das Kapital" কে নিয়া এক ধরণের ভাষার ইন্টারপ্রিটিভ খেলা দেখাইসেন। আমি হাইডেগেরের Dasein কে বাংলায় "দাস-আইন" লিখসি।

[5]  “গুড সেক্যুলার” ধারণাটা আমার পাশাপাশি তরিকুল হুদা এবং আব্দুর রহমান বারির নানা আলাপে এবং লিখায় উইঠা আসছে। মুফতি হারুন ইজহার অনেক বছর আগে এই টার্মটা ব্যবহার করেন দেশের একজন ভাবুক ও চিন্তক বর্ণনা করতে। হারুন ইজহার ওই সময়ে 'গুড সেক্যুলার' আক্ষরিক ভাবেই বলসিলেন। বুঝাইতে চাইসিলেন, এই ভাবুক ভালো কিন্তু সে তো অবশ্যই সেক্যুলার মানুষ। এই টার্মটা পরে তরিকুল হুদা আর আমি মাহমুদ মামদানির ফ্রেজিঙ "গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম" থিকা উল্টায়া আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা শুরু করি। গুড সেক্যুলাররা ভালগার সেক্যুলারদের মতো ইসলামীদের কল্লা কাটতে চায় না, কিন্তু ডিসিপ্লিনারি লজিক ব্যবহার কইরা ইসলামীদের রিপ্রোগ্রামিং করতে চায়। লক্ষ্য একই: সেক্যুলারিজম। সেক্যুলারিজম আপনে জোর কইরা ঠাইসা মুখে ঢুকাইবেন নাকি আদর কইরা ভুলায়া ভালায়া খাওয়াইবেন সেইটা জাস্ট ট্যাকটিক্যাল প্রশ্ন।

[6] Frantz Fanon, Black Skin, White Masks, Richard Philcox (Trans.), Grove Press, 2008 (1952).

[7] Frank B. Wilderson, "Gramsci's Black Marx: Whither the Slave in Civil Society?," Social Identities, 9(2), 225–240, 2003.

[8] Subrata Roy Chowdhury, The Genesis of Bangladesh, Asia Publishing House, 1972.

[9] "As a psychoanalyst, I should help my patient to become conscious of his unconscious and abandon his attempts at a hallucinatory whitening, but also to act in the direction of a change in the social structure." (Fanon, 100)

[10] Talal Asad, "The Idea of an Anthropology of Islam," Occasional Papers Series, Center for Contemporary Arab Studies, Georgetown University, 1986.

[11] Juliet Flower Maccannell, "After the Patriarchy: the Regime of the Brother," Paragraph, Vol 14, No. 1, 1991.

[12] Achille Mbembe, "Necropolitics," Libby Meintjes (Trans.), Public Culture, 2003.

August 08, 2026 /Tanzeen Doha
  • Newer
  • Older

All content is the property of Milestones Journal and its contributors. All rights reserved.