ওসমান ভাই: এক প্রজন্মের অসমাপ্ত কণ্ঠস্বর
আরিফ রব্বানী
প্রথম দেখা
ওসমান ভাইকে প্রথম দেখি ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদ্রাসার বাৎসরিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। এলোচুল, গায়ে সাদা চাদর, সামনে প্রায় আড়াই-তিন হাজার শিক্ষার্থী-মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর প্রিয় বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। ছোটবেলার আমার কাছে সেই দৃশ্যটা ছিল এক ধরনের বিস্ময়। মনে হয়েছিল, কিছু মানুষ শুধু কথা বলে না, তারা উপস্থিত হয়।
আমি নেছারাবাদ মাদ্রাসায় ভর্তি হই ২০০৮ সালে। ওসমান ভাই তখন আলিম পরীক্ষার্থী-মাদ্রাসাজীবনের শেষ বর্ষে। পরে আমাদের ক্লাস টিচার হিসেবে পাই তাঁর বড় ভাই ড. আবু বকর সিদ্দিক সাহেবকে, যাকে আমরা “নলছিটির হুজুর” বলতাম। তাঁর মুখে ওসমান ও ওমর-দুই ভাইয়ের নানা গল্প শুনতাম। সেই সময় থেকেই নাম দুটো আমাদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
একদিন দেখি আলিমের ভাইয়েরা মাদ্রাসার সামনে ঢাবিতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বৈষম্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করছেন। সামনে ছিলেন ওসমান ভাই। সম্ভবত সেই সময় থেকেই তাঁকে নেতৃত্ব দিতে দেখা শুরু।
টাঙ্গাইল সফর ও প্রথম ব্যক্তিগত পরিচয়
দশম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় উস্তাজ আবু বকর সিদ্দিক সাহেব একদিন বললেন, তিনি টাঙ্গাইলে একটি মাদ্রাসা ভিজিটে যাবেন, আমি তাঁর সঙ্গে যেতে চাই কি না। যথারীতি রাজি হয়ে গেলাম। তিন দিনের সফর শেষে ফেরার পথে টাঙ্গাইলের বিখ্যাত চমচম নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাই। হুজুর বললেন, “চলো, ওসমানের মেসে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ডিনার করে বরিশালের পথে বের হই।”
সম্ভবত এটাই ছিল ওসমান ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম ব্যক্তিগত পর্যায়ের সাক্ষাৎ।
তখন তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন সিনিয়র ভাই থাকতেন-যতদূর মনে পড়ে, বোরহান ভাই, রেজাউল করিম ভাইসহ আরও অনেকে। আমরা পৌঁছানোর পর আড্ডা, খাওয়া-সবকিছু মিলিয়ে এক উষ্ণ পরিবেশ। কিন্তু যাওয়ার সময় যখন আমাদের মিষ্টির প্যাকেটগুলোর খোঁজ করলাম, ওসমান ভাই হেসে বললেন,
“ওগুলা তো শেষ!”
ঢাকা, শাপলা ও বন্ধুত্ব হয়ে ওঠা
২০১১ সালে আমি ঢাকায় চলে আসি এবং দারুন্নাজাতে আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হই। সে সময় ওসমান ভাই ঢাকায় অবস্থানরত নেছারাবাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি ফোরাম গঠনের উদ্যোগ নেন। যথারীতি আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, আমাদের ব্যাচের যারা আছে তাদেরও যেন সঙ্গে নিয়ে আসি।
স্মরণ হয়, আমাদের ব্যাচের বেশ কয়েকজনকে নিয়ে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। দিনব্যাপী প্রাণবন্ত আলোচনা, স্মৃতিচারণ, পরিকল্পনা এবং আন্তরিক মিলনমেলায় সময় কেটেছিল। দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন ব্যাচের ভাইদের একত্রিত হওয়ার সেই উদ্যোগ সবাইকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। অনুষ্ঠান শেষে আমরা প্রত্যেকেই এক ধরনের আনন্দ ও আশাবাদ নিয়ে ফিরে এসেছিলাম।
এরপর আসে ৫ ই মে ২০১৩।
শাপলার ঘটনা আমাদের অনেকের মতো আমাকেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার চিন্তা আগেই ছিল, কিন্তু সেই ট্র্যাজেডি সিদ্ধান্তটাকে আরও ত্বরান্বিত করে। IELTS প্রস্তুতির জন্য বন্ধু শিহাবকে নিয়ে তেজতুরীপাড়ায় একটি মেসে উঠি। আর ওসমান ভাই থাকতেন হাতিরঝিলের ওপাশে, মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় তাঁর বোনের বাসায়।
এই সময় থেকেই মূলত “ওসমান ভাই” ধীরে ধীরে “বন্ধু” হয়ে ওঠেন।
তিনি সাইফুরস-এ ইউনিভার্সিটি কোচিং ও স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস নিতেন। মাঝেমধ্যে বলতেন, “চলো, আমার সঙ্গে ক্লাসে।” হাতে তখন সময় ছিল, তাই প্রায়ই তাঁর সঙ্গে হেঁটে মৌচাক ব্রাঞ্চে যেতাম। ক্লাস শেষে নিচে চা, দীর্ঘ আড্ডা, তারপর বাসায় ফেরা। কখনো গভীর রাতেও হাতিরঝিলে বসে গল্প হতো।
হেফাযতের আন্দোলনে সময় আমার ক্লাসমেট এবং ফ্রেন্ড শিহাব হেফাজতের মিছিলে অংশ নেওয়ার কারণে ছাত্রলীগের হাতে রাতভর নির্যাতনের শিকার হয় এবং কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে যায়। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের ভেতরে একটি কমন রাজনৈতিক ও নৈতিক বোধ তৈরি করে।
নিঃসন্দেহে, আমরা যে মাদ্রাসা থেকে উঠে এসেছি, সেইটা গতনাগুতিক মাদ্রাসার মতো না, আমাদের শেখানো হয়েছিল—শুধু আলেম হলেই চলবে না; যুগসচেতন আলেম হতে হবে, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিতে হবে।
সেটি আমাদের ভেতরে গভীর নৈতিক সচেতনতার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।
এক প্রজন্মের কণ্ঠস্বর
আমি আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের অনেকের সঙ্গেই বলতাম-ওসমান ভাইয়ের আমাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠাটা কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটা ছিল বিভিন্ন ইসলামি ভাবধারার এক অভূতপূর্ব সম্মিলন। অনেক সময় মনে হতো, তিনি যেন শুধু নিজের কথা বলছেন না; বরং আমাদের অগণিত আড্ডা, বিতর্ক, স্বপ্ন ও হতাশার ভাষা হয়ে উঠেছেন।
আমাদের পড়াশোনার বড় একটা সময় কেটেছে তাসাওউফকেন্দ্রিক মাদ্রাসা পরিবেশে। সেখানে আমরা শাহ ওয়ালিউল্লাহর সংস্কারচিন্তা, সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ ও শাহ ইসমাঈল শহীদের বালাকোটের সংগ্রাম, দেওবন্দের প্রতিষ্ঠা, খিলাফত আন্দোলন থেকে পাকিস্তান আন্দোলন পর্যন্ত উপমহাদেশের নানা ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বয়ান শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু একইসঙ্গে হয়তো আরেক ধরনের বাস্তবতাও অনুভব করেছি—শুধু ইতিহাসের স্মৃতি বহন করলেই চলবে না, ইতিহাসের সক্রিয় অংশও হতে হবে।
ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে ইসলামিজমের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বোঝাপড়াও তৈরি হয়। আবার একইসঙ্গে বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিচয় নিয়েও কোনো হীনমন্যতা কাজ করত না। এই দুই ধারার সম্মিলন- ইসলামি চেতনা ও বাঙালি মুসলিম আত্মপরিচয়-ওসমান ভাইয়ের ব্যক্তিত্বে এক অসাধারণ ভারসাম্য তৈরি করেছিল।
শাপলার ঘটনাও আমাদের প্রজন্মকে বদলে দেয়। সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি ছিল না; বরং অনেকের জন্য মাঠে নামার, অবস্থান নেওয়ার এবং ইতিহাসকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করার শিক্ষা হয়ে ওঠে। আমরা অনেকেই হয়তো তখনও সক্রিয় ছিলাম না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেই সময়ের জন্যই প্রস্তুত হচ্ছিলাম।
সেই প্রস্তুতির চূড়ান্ত প্রকাশের সুযোগ আসে জুলাই অভ্যুত্থানে।
আমার কাছে ওসমান ভাই ছিলেন শাপলার সেই ‘সূর্যসন্তানদের’ একজন—যাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, কিন্তু যারা দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; যাদের ইসলামি চেতনা ছিল, কিন্তু যারা সংকীর্ণতা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন; এবং যারা বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে ভাষা দিতে সক্ষম ছিলেন।
মালয়েশিয়া - জুলাই আন্দোলন
আমি মালয়েশিয়ায় চলে যাওয়ার পরও ওসমান ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অটুট ছিল। কখনো দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা হতো, কখনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে, কখনো উনি বিদেশে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে, আবার কখনো নিছক আড্ডার জন্যই।
জুলাই আন্দোলনের সময় দেশের যাদের কাছ থেকে নিয়মিত খবর নিতাম, ওসমান ভাই তাদের অন্যতম। তাঁর একটা অসাধারণ গুণ ছিল- যোগাযোগ ধরে রাখতে পারা। একটা মেসেজ দিলেই হয়তো একটি ভয়েস নোট পাঠিয়ে পুরো পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরতেন। আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্য দিয়েই কেটেছে সেই সময়।
একেবারে শেষ দিকে তিনি বললেন, ঢাকায় থাকা আর নিরাপদ মনে করছেন না; বরিশালে চলে যাবেন। হাসিনা পতনের সময় তিনি বরিশালেই ছিলেন, এবং সেখানকার একটি রিকশায় দাঁড়িয়ে দেওয়া তাঁর স্লোগান পরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
জুলাই-পরবর্তী সময় ও ইনকিলাব মঞ্চ
জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিপ্লবকে ধীরে ধীরে বেহাত হতে দেখে তাঁর মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়। তাঁর মূল্যায়ন ছিল-বিদ্যমান দলীয় বলয়ের বাইরে থেকে জুলাইয়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা প্রয়োজন। ইনকিলাব মঞ্চের শুরু থেকেই এর ধারণা ও পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা হতো।
এর মধ্যে তাঁর জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগদান ও পরবর্তীতে পদত্যাগের ঘটনাও ঘটে। ইনকিলাব মঞ্চের প্রায় প্রতিটি প্রোগ্রামের আপডেট দিতেন, মতামত চাইতেন। আমিও আমার মতো করে কিছু ফিডব্যাক দিতাম। আমার মতামত যে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা না, কিন্তু তিনি যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিতেন, আনন্দ নিয়ে এপ্রিশিয়েট করতেন- সেটা আমি খুব উপভোগ করতাম।
এক পর্যায়ে তুরস্কে নির্বাসিত আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। আমি জানতাম, ওসমান ভাই মাহমুদুর রহমানের লেখালেখি ও রাজনৈতিক চিন্তাধারায় গভীরভাবে প্রভাবিত। তাই বিষয়টি তাঁর সঙ্গে শেয়ার করি, এবং পরে একটি অনলাইন মিটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে তিনি মাহমুদুর রহমান সাহেবকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করা এবং একাধিক প্রোগ্রাম আয়োজনের কাজেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
শেষ ভয়েস মেসেজ
এরপর ব্যক্তিগত কিছু কারণে আমি প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে পড়ে যাই। অনেকদিন আর কথা হচ্ছিল না।
একদিন হঠাৎ মেসেজ দিলাম-
“আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?”
উনি ফিরতি একটি ভয়েস মেসেজ পাঠালেন- ““ও বেটা, ভুইলা গেলা নাকি? আমি না হয় বিজি হয়ে গেছি, তুমি খোঁজখবর নিবা না? ফ্রি হয়ে কল দিও, অনেক আলাপ জমে আছে।”
এইটাই ছিল তাঁর দিক থেকে পাওয়া শেষ কণ্ঠ।
আজও সেই ভয়েসটা কানে বাজে। জানি না কতবার শুনেছি- হয়তো শুনেই যাবো, পরবর্তী সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত। সেই সাক্ষাৎ, যেদিন আমাদের হাতে থাকবে অফুরন্ত সময়, আর পিছনে পড়ে থাকবে এই জীবনের সব পরাজয়ের গল্প।
হয়তো প্রথম দেখাতেই বলতে হবে-
“দুঃখিত ভাই, আমি আর ফ্রি হতে পারিনি...
আর আপনি যে ন্যায়বিচার দেখতে চেয়েছিলেন, আমরা এখনো তা নিশ্চিত করতে পারিনি।
ক্ষমা করবেন কি?”
